কক্সবাজারে রিসোর্টে আগুন

নিহত তিনজনের পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়নি এখনো ব্যবস্থাপক গ্রেফতার

অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ওসি আতিকুর জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পরিচয়সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ২৩ জনকে আসামি করে দায়ের করা এ মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি আসামিরা অজ্ঞাতপরিচয়। এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। প্রয়োজনে ঢাকার বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার গতকাল জানান, গত শনিবার রাতে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর ও নেওয়াজ মোর্শেদসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম ওরফে সুমনকে শনিবার বিকালে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়। পরে এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ওসি আতিকুর জানান, উদ্ধার হওয়া মরদেহ, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পরিচয়সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বর্তমানে মরদেহগুলো কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

কক্সবাজারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন হাসপাতালে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল এনে কক্সবাজারেই পরীক্ষা সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হবে। কক্সবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক অগ্নিদুর্ঘটনা হওয়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সময়ের মধ্যে মরদেহগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

গত শনিবার সকাল ৭টার দিকে উখিয়ার মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। প্রায় ৭ ঘণ্টা ধরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় দগ্ধ ও অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচতে গিয়ে আহত হওয়া ছয় পর্যটক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর কক্সবাজার থেকে ফায়ার সার্ভিসের টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছতে ২৫ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু কাঠ ও বোট দিয়ে তৈরি রিসোর্টটি দ্রুত পুড়ে যাওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের টিম পৌঁছার আগেই আটকে পড়া পর্যটকরা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।

নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) এবং আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৮)। বাকি তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা মরদেহগুলোর অবস্থানের বিভিন্ন মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের দোতলার একটি কক্ষে বিছানার ওপর পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া যায়। একই কক্ষের শৌচাগারে পাওয়া যায় আরেকজনের মরদেহ। তৃতীয় তলার একটি শৌচাগারে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় আরো চারজনকে। আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হওয়ায় সরাসরি পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দীন (৩১) ও তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯)। এছাড়া মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। আহতদের মধ্যে চারজনের শরীর ৩০-৪০ শতাংশ পুড়ে গেছে। বাকি দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, রিসোর্টের বিভিন্ন অংশে কাঠ ও প্লাস্টিকের বোর্ড ব্যবহার করায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যার কারণে ভেতরে থাকা পর্যটকরা দ্রুত নিরাপদে বের হয়ে আসতে পারেননি। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান।

এদিকে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধ অনুমোদন নেয়নি। অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, টুকটুক রিসোর্ট নির্মাণের কোনো অনুমোদন ছিল না। এজন্য মেরিন ড্রাইভ এলাকার আড়াই হাজার স্থাপনার মধ্যে ১৫০টি প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে নোটিস দেয়া হয়েছে। নোটিস পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটিও ছিল। শিগগিরই এসব অনুমোদনহীন রিসোর্টের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার কথা ছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের।

কক্সবাজার পর্যটন ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দিন দিন কক্সবাজারে পর্যটক সমাগম বাড়ছে। কক্সবাজারের সৈকত-তীরবর্তী খালি ভূমি না থাকায় মেরিন ড্রাইভকে কেন্দ্র করে হোটেল-রিসোর্ট তৈরি বেড়েছে। রিসোর্ট বা হোটেল থেকে সৈকত দৃশ্যমান হলে ভাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে নেয়া যায়। যার কারণে এক টুকরো জমি ক্রয় করেই কাঠ বা ইটের গাঁথুনি দিয়ে প্রাকৃতিক রিসোর্টের নামে পর্যটন ব্যবসায় নেমেছেন অনেকে। কক্সবাজারে বাড়তি পর্যটক রাখার পরিকল্পিত কোনো আবাসন ব্যবস্থা না থাকায় মেরিন ড্রাইভসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। অনলাইনে বিপণন জনপ্রিয় হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা সহজেই এসব রিসোর্টে এসে ওঠেন।’ জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলোর মেরিন ড্রাইভ এলাকার তদারকি সীমিত থাকায় প্রায়ই সৈকতে ডুবে যাওয়াসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আরও