রিএজেন্ট বা বিকারক একটি রাসায়নিক উপাদান। নির্ভুল রোগ নির্ণয়ে এটি অত্যাবশ্যকীয়। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য ২০২২ সালের শেষদিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক দুটি মেশিন। এর মধ্যে অটো বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার মেশিনে রক্তের গ্লুকোজ ও সিরাম ক্রিয়েটিনিন অর্থাৎ ডায়াবেটিস ও কিডনির রোগ নির্ণয় করা হয়। আর অটোমেটিক সেল কাউন্টার মেশিন দিয়ে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (সিবিসি) করা হয়। মেশিন দুটির সঙ্গে সে সময় সরবরাহ করা রিএজেন্ট ওই বছরের নভেম্বরেই শেষ হয়ে যায়। এরপর দুই বছর পার হয়ে গেলেও নতুন করে রাসায়নিকটি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রিএজেন্ট সংকটে ব্যবহার হচ্ছে না মেশিন দুটি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন টেকনিশিয়ানরা।
অবশ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্যাথলজি বিভাগের মেশিন দুটিতে যে রিএজেন্ট ব্যবহার করা হয় সেগুলো দামি। প্রতি বছরের রিএজেন্টের জন্য যে টেন্ডার আহ্বান করা হয়, সেখানে রিএজেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। এজন্য বিশেষভাবে টেন্ডার করতে হয়।
রংপুরে সরকারি পর্যায়ে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানে রোগীরা স্বল্পমূল্যে সরাসরি পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পান। তবে রিএজেন্ট সংকটে কমছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিছু পরীক্ষা এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে ল্যাব টেকনোলজিস্ট মো. আলী আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অটো বায়োকেমিস্ট্রি অ্যানালাইজার মেশিন চালু থাকলে নিখুঁতভাবে রোগীর লিপিড প্রোফাইল, বিলিরুবিন, ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড, ব্লাড ইউরিয়া, এলসিপিটি এবং এসজিপিটি নির্ণয় করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, এ মেশিনে আধা ঘণ্টায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৬০টির মতো স্যাম্পলের পরীক্ষা করা সম্ভব। আবার দ্বিতীয়টি অর্থাৎ অটোমেটিক সেল কাউন্টার মেশিন চালু থাকলে নিখুঁতভাবে হেমাটোলজিক্যাল টেস্ট, কমপ্লিট ব্লাড কাউন্টসহ (সিবিসি) রক্তের ক্যান্সার, রক্তশূন্যতা ও রক্তের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা যায়। ঘণ্টায় ৭০-৮০টি পরীক্ষা করা সম্ভব। অত্যাধুনিক মেশিন থাকার পরও এর সুবিধা আমরা নিতে পারছি না। পরীক্ষাগুলো আমরা অ্যানালগ পদ্ধতিতে (স্লাইডে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা) করতে বাধ্য হচ্ছি। এতে পরীক্ষা করতে সময় যেমন লাগছে, আবার শতভাগ নিখুঁত যে হচ্ছে তাও বলা যাচ্ছে না।’
হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. সরকার মনিরুজ্জামান রিংকু বলেন, ‘প্যাথলজি বিভাগে মেশিন দুটিতে যে রিএজেন্ট ব্যবহার করা হয় সেগুলো দামি। হাসপাতালে প্রতি বছরের রিএজেন্টের জন্য যে টেন্ডার (নির্দিষ্ট এমএসআর) আহ্বান করা হয়, সেখানে দামি রিএজেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয় না। এজন্য বিশেষভাবে টেন্ডার করতে হয়।’
তবে তিনি স্বীকার করেন বিশেষ টেন্ডার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে করা সম্ভব না হওয়ায় বরাদ্দকৃত টাকা পুনরায় সরকারের কোষাগারে ফেরত যাওয়ারও নজির রয়েছে। ডা. সরকার মনিরুজ্জামান রিংকু বলেন, ‘নতুন পরিচালক প্যাথলজির মেশিন দুটির রিএজেন্ট আনার জন্য কার্যক্রম শুরু করেছেন। তবে তার আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হতে চাচ্ছে মেশিন দুটি সচল আছে কিনা। এজন্য সরবরাহকারী কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।’
রমেক হাসপাতাল এবং কয়েকটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে সিবিসি পরীক্ষা করতে ফি নেয়া হয় ১৫০ টাকা। সিরাম ক্রিয়েটিনিন ৫০ টাকা এবং ব্লাড গ্লুকোজ ৬০ টাকা। এর বিপরীতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেয়া হচ্ছে যথাক্রমে ৪০০ ও ১৫০ টাকা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ক্লিনিক্যাল প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. শিহাব রেজওয়ানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ২৫০-৩০০ রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর দ্বিগুণ রোগী বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের জন্য প্যাথলজি বিভাগে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু অ্যানালগ পদ্ধতিতে রোগ নির্ণয় কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় সবার পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিন দুটি চালু থাকলে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হতো।’
শুধু রিএজেন্টের অভাবে মূল্যবান মেশিন দুটি নষ্ট হতে চলেছে। এ বিষয়ে বিগত সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি, জানতে চাইলে রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি জানান, হাসপাতালের ইতিবাচক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ প্রথম তিনি হাসপাতালের সব ধরনের টেন্ডার ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্টের (ই-জিপি) মাধ্যমে সম্পন্ন করার কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে এজন্য অনুমতির প্রয়োজন। এরই মধ্যে অনুমতি নিতে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছেন দ্রুতই অনুমোদন পাওয়া যাবে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি একটি টেন্ডারে দুষ্কৃতকারীরা অন্যদের অংশগ্রহণে বাধা দিয়েছে। তাই এখন থেকে টেন্ডারগুলো ইজিপিতে করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আশা করছি ই-জিপি টেন্ডার শুরু হলে শুধু প্যাথলজি বিভাগ নয়, মেডিকেলের উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।’