দেশের ভবন নির্মাণে সঠিক ডিজাইনের পাশাপাশি নির্মাণকালীন তদারকি ব্যবস্থা জরুরি হলেও পুরো দেশের জন্য এখনো একটি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এ ‘আবাসন, নির্মাণ ও টেকসই নগরায়ণ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বলেন, বড় বড় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অনেকের নিজস্ব কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের সব ভবনের নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার মতো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা এখনো নেই।
অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, একটি ভবন নিরাপদ হওয়ার জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি হলো সঠিক ডিজাইন এবং অন্যটি হলো নির্মাণকালীন তদারকি। আমাদের একটি ভালো বিল্ডিং কোড রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবীরা যদি সেই কোড অনুযায়ী ডিজাইন করেন, তাহলে ভবনের ডিজাইন মোটামুটি মানসম্মত হবে। কিন্তু নির্মাণকালীন তদারকির জায়গায় এখনো আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৯৩ সালে দেশে বিল্ডিং কোড প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে সেটি হালনাগাদ করা হয়েছে। বিল্ডিং কোড মূলত ভবন নির্মাণের জন্য একটি গাইডলাইন। এ কোড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে শুধু ভালো কোড থাকলেই হবে না, সেটি অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
অধ্যাপক ইশতিয়াক বলেন, রাজউকসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইতোমধ্যে প্রকৌশলীদের নিবন্ধন এবং ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করেছে। ফলে ভবনের ডিজাইনের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু নির্মাণকাজ চলাকালীন সেটি অনুমোদিত ডিজাইন ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি।
এ ক্ষেত্রে বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিল্ডিং কোডে একটি ওভারসাইট অথরিটির কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি আইন করে এ ধরনের কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এটিকে কার্যকর করতে বিধিমালা, অর্গানোগ্রাম, জনবল ও বাজেটসহ প্রয়োজনীয় কাঠামো দ্রুত তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, এ কাজ শুধু সরকারি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বা পেশাজীবীর মাধ্যমে ভবনের নির্মাণকাজ প্রত্যয়ন করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্দিষ্ট একটি ভবন নির্ধারিত মান অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে কিনা, তা দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাজীবী সার্টিফাই করবেন। এরপর সেই সার্টিফিকেশনের ভিত্তিতে অকুপেশন সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।
বিদ্যমান ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের কোনটি নিরাপদ, কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভেঙে ফেলা প্রয়োজন—তা নির্ধারণে একটি পদ্ধতিগত অ্যাসেসমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা যদি আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এ অ্যাসেসমেন্ট করতে পারি, তাহলে আমাদের হাতে একটি তালিকা থাকবে—কোন ভবন নিরাপদ, কোন ভবনে রেট্রোফিটিং প্রয়োজন এবং কোন ভবন ডেমোলিশ করতে হবে।
ভবনের নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপদ অবকাঠামো নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে দেশের তৈরি পোশাক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনসের দুর্ঘটনার পর গার্মেন্ট খাতে ভবন নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতা অন্যান্য খাতেও কাজে লাগাতে হবে।