সাত বছর পর স্থগিত দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাট আধুনিকায়ন প্রকল্প

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগের প্রধান রুট দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুট।

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগের প্রধান রুট দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুট। বর্ষা মৌসুমে পদ্মার ভাঙন আর শুষ্ক মৌসুমে ডুবোচরে ফেরি আটকে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রী ও যানবাহন চালককে। ভোগান্তি লাঘবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ফেরিঘাটের আধুনিকায়ন করতে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ। যদিও নকশায় ত্রুটি ও জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সাত বছরে প্রকল্পটির দৃশ্যমান কাজ হয়নি। সর্বশেষ প্রকল্পটি স্থগিত করে জেলা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। আপাতত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট আধুনিকায়ন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ফেরিঘাট আধুনিকায়নে ৬৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় বিআইডব্লিউটিএ। প্রকল্পের অধীনে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় চার কিলোমিটার ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় দুই কিলোমিটার ঘাট আধুনিকায়ন করার কথা ছিল। কাজটি বাস্তবায়ন করছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০২১ সালে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু করতে না পারা ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। নকশা বিশ্লেষণ করতে দেয়া হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট)। বুয়েট কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে নকশাটি চূড়ান্ত করে।

দৌলতদিয়া ঘাট ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য আড়াই বছর আগে ঘাট এলাকার ৭০০ পরিবারের বসতভিটা, দোকানসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্দোবস্ত নেয়ার জন্য তালিকা প্রণয়ন করা হয়। পরে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়। এ কারণে আড়াই বছর ওই এলাকার মানুষের দিন কেটেছে নতুন স্বপ্নে। নিজের গাছের ফলও ভোগদখল করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। দেয়া হয়নি জমি বন্দোবস্তের টাকা।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সময়মতো অর্থছাড় ও পরিকল্পনা থাকলে এতদিনে ঘাট আধুনিকায়ন কাজ শেষ হয়ে যেত। যখন প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল, ওই সময়কার ব্যয়ের তুলনায় এখনকার ব্যয় তিন গুণ বেশি। আবার নকশার ত্রুটির কারণে দিনের পর দিন আটকে থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি।’

দৌলতদিয়া ঘাট এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখনো জানেই না প্রকল্পটি বা তাদের জমি বন্দোবস্তের খবর।

দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবসায়ী চান্দু মোল্লা বলেন, ‘আমরা অনেক আশায় ছিলাম, ঘাট আধুনিকায়ন হবে। এ এলাকার মানুষের জীবনমান ও ব্যবসার উন্নয়ন হবে। আড়াই বছর আগে আমাদের বাড়িঘরের মাপজোখ করে  গেছে। কর্মকর্তারা বলে গেছেন, এগুলো বন্দোবস্ত নেয়া হয়েছে। কেউ বাড়িঘর মেরামত বা স্থানান্তর করবেন না। আবার গাছপালা কাটার বা ফল খাওয়ার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমরা এখনো জানি বড় প্রকল্প হবে। এ এলাকার উন্নয়ন হবে।’

দৌলতদিয়া ৪ নম্বর ঘাটের বাসিন্দা সোহরাব মিয়া বলেন, ‘জমি বন্দোবস্তের নামে আমাদের দুই-তিন বছর আশায় রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন আর কোনো খোঁজখবর নেই। সঠিকভাবে কেউ বলছে না এখানে কাজ হবে কিনা। আড়াই বছর জমি, ঘরবাড়ি বন্দোবস্তের নামে আমাদের কোনো কাজ করতে দেয়নি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ।’

বিআইডব্লিউটিএ দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানি কাজটি হয়তো হবে। তবে কবে শুরু হবে সেটার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য আমাদের জানা নেই।’ এর চেয়ে বেশি কিছু তথ্য প্রয়োজন হলে বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

এ বিষয়ে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট আধুনিকায়ন প্রকল্পটিকে স্থগিত করে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ রাজবাড়ী জেলা প্রশাসককে একটি চিঠি দিয়েছে। যার কপি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে।’

জেলা প্রশাসক আবু কায়সার খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ঘাট এলাকায় জমি বন্দোবস্তের পরিকল্পনা ও অগ্রগতি করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে অর্থ না দেয়া এবং জরিমানার টাকা পরিশোধ না করায় বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে প্রকল্পটি স্থগিত করে চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। ভবিষ্যতে প্রকল্পের কাজ করা হলে নকশা বা অর্থছাড় সবকিছুই নতুন করে করা হবে।’

এদিকে ভাঙন থামছে না দৌলতদিয়া ইউনিয়নে। এ বছরও দৌলতদিয়ার ৬ ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকা এবং লঞ্চ ঘাটের বিপরীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হয়েছে বাড়িঘরসহ ফসলি জমি। এখনো ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে শত শত পরিবার।

দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট এলাকার বাসিন্দা মিলন মোল্লা বলেন, ‘পদ্মার ভাঙনের কারণে দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বেশির ভাগ জমিই বিলীন হয়ে গেছে। এ বছরও যখন ভাঙন দেখা দেয়, তখন সামান্য জিও ব্যাগ ফেলা ছাড়া কোনো কাজ হয়নি। ঈদুল আজহার দুদিন আগে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান ঘাট এলাকা পরিদর্শনে এসে বলেছিলেন ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার কাজ হবে। তাই ভাঙন রোধে আপাতত জিও ব্যাগ ফেলা ছাড়া তেমন কাজ করা যাচ্ছে না।’

আরও