দেশের বাজারে ভরা মৌসুমেও সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ। এ পরিস্থিতিতে বাঙালির প্রিয় এ মাছটির আকার অনুযায়ী খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।
বাজারে ইলিশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। গতকাল নিজেদের সুপারিশ প্রতিবেদন তুলে ধরে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি জানায়, চলতি সেপ্টেম্বরে ইলিশের কেজিপ্রতি দাম ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। গত পাঁচ বছরে স্থানীয় বাজারে মাছটির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৫৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। এ সমীক্ষাটি করা হয়েছে টিসিবির মূল্য তালিকার ভিত্তিতে। যদিও মাছ বিক্রেতা ও ভোক্তারা বলছেন, বাজারে এক কেজি ওজনের ইলিশ এখন ২ হাজার ৫০০ টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আকার ও মান ভালো হলে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে আরো বেশি দামে।
ট্যারিফ কমিশন বলছে, স্থানীয় বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ইলিশ রফতানি হয়। সেপ্টেম্বরে স্থানীয় বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম যেখানে ২ হাজার ২০০ টাকা ছিল, ভারতে তা রফতানি করা হয়েছে ১ হাজার ৫৩৪ টাকায়। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বিদ্যমান রফতানি মূল্যে মুনাফা হলে স্থানীয় বাজারের মূল্যে ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন উৎপাদন মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক হারে।
প্রতিবেদনে ইলিশের মূল্যবৃদ্ধির জন্য ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে ট্যারিফ কমিশন। এগুলো হলো চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা, মজুদ ও সিন্ডিকেট, জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, মাছ ধরার খরচ বৃদ্ধি, নদীর নাব্য সংকট ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে উৎপাদন প্রভাবিত হওয়া, অবৈধ জালের ব্যবহার, দাদন, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও রফতানির কারণে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহের চাপ।
ট্যারিফ কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরেছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের সাপ্লাই চেইন আরো উন্নত হবে এবং জেলে ও ভোক্তাদের জন্য সহায়ক হবে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য বন্ধে জেলেদের সমবায় সমিতি গঠনে উৎসাহিত করা, বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও সাপ্লাই চেইনের ধাপ কমাতে সরকারিভাবে অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি, ন্যায্যমূল্যে ইলিশ নিশ্চিতে উৎপাদন মৌসুমে দেশের প্রধান শহরগুলোয় সরকারি উদ্যোগে বিশেষ বিপণন কেন্দ্র স্থাপন, মাছের অপচয় রোধ এবং গুণগত মান বজায় রাখতে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র এবং প্রধান পরিবহন বুটগুলোয় আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, আইস প্লান্ট এবং রেফ্রিজারেটেড ভ্যান-ট্রাক নিশ্চিত করা। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য মৎস্য সাপ্লাই চেইনে সম্পৃক্ত আড়তদার ও পাইকারদের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্সের আওতায় আনা, কৃত্রিম সংকট ও অধিক মুনাফা রোধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত বাজার তদারকির ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে জেলেদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে তাদের কাছে প্রতিদিনের বাজারদর, চাহিদা এবং সরবরাহের তথ্য সরকারিভাবে মোবাইলে এসএমএস বা অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা, লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে এবং দাদন ব্যবসায়ীদের প্রভাব কমাতে জেলেদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম চালু করা। জেলেদের মাছ ধরা-পরবর্তী পরিচর্যা, সংরক্ষণ এবং প্রাথমিক বিপণন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া; সহজ শর্তে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ এবং ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা ও ইলিশের আকার অনুযায়ী সরকারিভাবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।