মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত সর্বশেষ জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মনিটরিং প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, চলতি বছরের মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা আগের মাসের তুলনায় আরো বেড়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলোর ঊর্ধ্বগতি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ৩১২টি, যা মে মাসে বেড়ে ৩২৬টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সহিংসতার চিত্র আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ধর্ষণের ঘটনা। এপ্রিলে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫৪টি, যা মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮টিতে। এক মাসেই প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়েছে এ অপরাধ। একই সময় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৪ থেকে বেড়ে ১৬টি এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দুই থেকে বেড়ে ছয়টিতে পৌঁছেছে। যৌন হয়রানির ঘটনাও ১৭ থেকে বেড়ে ১৮টি হয়েছে। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার এ ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। এমএসএফের মতে, এসব পরিসংখ্যান সমাজে নারী ও শিশুদের ক্রমবর্ধমান অনিরাপদ অবস্থারই প্রতিফলন।
এদিকে মে মাসে নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে অনলাইন জুয়া ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিস্তার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময় মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনায় চারজন নিহত, ১৯ জন আহত এবং ১৫ জন আটক হয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দুটি ঘটনা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার তিনটি অভিযোগও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
এমএসএফের নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ধরন দিন দিন আরো জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা কমেছে, তবে যৌন সহিংসতা, ডিজিটাল অপরাধ, অনলাইন জুয়ার বিস্তার ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন সূচক আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি সময়ে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নানাভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখছি। ধর্ষণ হচ্ছে। নারীকে মতামত প্রকাশের কারণে হাতে আক্রমণ করা হচ্ছে। এক মাস থেকে পরবর্তী মাসে জ্যামিতিক হারে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে। অতীতে এসব ঘটনার বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়নি। এসব বিচার দ্রুত না হওয়ায় অপরাধীদের মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। আবার আক্রান্ত ভুক্তভোগী বছরের পর বছর ঘুরেও ন্যায় বিচার পাচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘সামাজিক ভাবেও নারী ও শিশুদের সুরক্ষার একটা প্রবণতা আগে লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে তেমনটা আর দেখা যাচ্ছে না। অপরাধীরা এ ধরনের অপরাধ করলেও তারা স্বীকারই করেন না এটা অপরাধ। উল্টো নারীকেই দোষ দেয়া হয়। বলা হয়, নারীর উগ্র পোশাকের কারণে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এখানে সমাজের সব স্তরের মানুষকে একত্র হতে হবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। এখানে শুধু অভিযুক্ত গ্রেফতার হলেই চলবে না, বিচারটাকে চূড়ান্ত করে দৃশ্যমান করতে হবে। তাহলেই দেখা যাবে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। যে ব্যাক্তি এ ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত হবেন, তাকে তার উত্তরাধিকার সম্পদের সুবিধাপ্রাপ্তি বাতিল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় কোনো সুযোগ সুবিধা এসব অপরাধীরা পাবেন না, এটা নিশ্চিত করতে হবে।’
নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় পুলিশের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ রয়েছে। বিশেষ করে দেশের প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু হেল্প ডেস্ক রয়েছে। এছাড়া ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারও রয়েছে। যখনই আমরা কোনো নারী বা শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পেয়ে থাকি, তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।’