সার্ক নিষ্ক্রিয় হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় চাল কূটনীতি বাড়ছে

অর্থনৈতিক দুর্বিপাকে পড়ে গত বছর নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে শ্রীলংকা। এর আগেই দেশটিতে খাদ্য ঘাটতি চরম আকার নিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানিও করতে পারছিল না শ্রীলংকা। ঠিক এমন মুহূর্তে দেশটির জন্য খাদ্যসহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে ভারত। এপ্রিলের শুরুর দিকে প্রথম খাদ্যসহায়তা হিসেবে ৪০ হাজার টন চাল নিয়ে

অর্থনৈতিক দুর্বিপাকে পড়ে গত বছর নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে শ্রীলংকা। এর আগেই দেশটিতে খাদ্য ঘাটতি চরম আকার নিয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানিও করতে পারছিল না শ্রীলংকা। ঠিক এমন মুহূর্তে দেশটির জন্য খাদ্যসহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে ভারত। এপ্রিলের শুরুর দিকে প্রথম খাদ্যসহায়তা হিসেবে ৪০ হাজার টন চাল নিয়ে শ্রীলংকার উদ্দেশে রওনা দেয় ভারতীয় একটি জাহাজ।

নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণার পরও চালের জন্য ভারতের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে শ্রীলংকাকে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল আমদানির জন্যও ভারতের সম্প্রসারিত ক্রেডিট লাইন সহায়তা প্রয়োজন পড়েছে দেশটির। জুনে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে ঘোষণা দেন ভারতীয় ক্রেডিট লাইনের অধীনে ৫০ হাজার টন চাল আমদানি করবে দেশটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রীলংকার বিপদের মুহূর্তে আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরাম হিসেবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারত সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে সার্ক একপ্রকার মৃত অবস্থায় আছে। মুহূর্তে চালের মতো জরুরি খাদ্যের জন্য দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে এখানকার দেশগুলোকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকলেও বৈরিতাকে ছাপিয়ে চাল কূটনীতির ওপরই বেশি নজর দিতে হচ্ছে দেশগুলোকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রয়োজনীয়তাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে বাংলাদেশের। এর মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রয়োজন মেটাতে সেখান থেকে চাল আনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মিয়ানমারের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য গ্লোবাল জানিয়েছে, গত সপ্তাহেও দেশটি থেকে বাংলাদেশে চাল আমদানি হয়েছে আড়াই হাজার টন। 

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সঙ্গে এক সমঝোতা সই করে বাংলাদেশ। সমঝোতার ভিত্তিতে ২০২৭ পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে মোট আড়াই লাখ টন আতপ চাল ৫০ হাজার টন আধা সেদ্ধ চাল আমদানি করা হবে। দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে জিটুজি চুক্তির আওতায় মিয়ানমার থেকে দেড় লাখ টন চাল আমদানি করেছে বাংলাদেশ।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিপীড়ন থেকে বাঁচতে দেশটি থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সবচেয়ে বড় ঢল আসা শুরু হয় ২০১৭ সালের আগস্টে। ওই বছরই প্রথম মিয়ানমার থেকে চাল আমদানি শুরু হয় বাংলাদেশের। দ্বিতীয়বার আমদানি হয় ২০২১ সালে। দেশটি থেকে চাল আমদানির বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন আখ্যা দিচ্ছেন চাল কূটনীতি হিসেবে। তাদের প্রত্যাশা চাল কূটনীতির মাধ্যমেই হয়তো দুই দেশ চলমান সংকটের সমাধান খোঁজার পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

পর্যবেক্ষকদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশ সরকার বাজারে চালের সরবরাহ ঠিক রাখতে মুহূর্তে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর একটি হলো কূটনীতির মাধ্যমে চালের আমদানি বাড়ানো। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক দেশই এখন খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। অবস্থায় প্রতিবেশীসহ রফতানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতেই হচ্ছে বাংলাদেশকে। আবার গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমারের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এখন কৃষি খাত। দেশটি আবার চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ। অবস্থায় বর্তমান পরিস্থিতিতে চাল কূটনীতিকেই ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে দুই দেশেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার এখন প্রতিবেশী ভারত থেকেও চাল আমদানি বাড়াতে জোর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে গত বছরের শেষ দিকে বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভারত থেকে চাল আমদানিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার্ষিক কোটা চাওয়া হয়। প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে ভারতও।

এছাড়া বর্তমানে জিটুজি পর্যায়ে চুক্তির ভিত্তিতেও ভারত থেকে চাল আমদানি বাড়াচ্ছে সরকার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য নিউজ মিলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ভারত থেকে আড়াই লাখ টন চাল আমদানির কথা রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে লাখ টন আনা হবে জিটুজির ভিত্তিতে। বাকি ৫০ হাজার টন আমদানি করা হচ্ছে ভারতের বেসরকারি খাতের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।

জিটুজি ভিত্তিতে আনা চাল সরবরাহ করবে মূলত দুটি সরকারি কো-অপারেটিভ। এর মধ্যে এক লাখ টন চাল সরবরাহ করবে নয়াদিল্লিভিত্তিক কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার (সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ কনজিউমার কো-অপারেটিভ সোসাইটি) এলসি খোলার ৭৫ দিনের মধ্যে চাল সরবরাহের কথা রয়েছে। এক্ষেত্রে এলসিতে প্রতি টন চালের দর ধরা হবে ৪৪৩ ডলার ৫০ সেন্ট। চালের ৭০ শতাংশ পাঠানো হবে জাহাজে। বাকি ৩০ শতাংশ আসার কথা রয়েছে রেলপথে ট্রেনে।

এছাড়া ন্যাশনাল কো-অপারেটিভ কনজিউমার্স ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া সরবরাহ করবে আরো লাখ টন। চাল সরবরাহ হবে এলসি খোলার ৭০ দিনের মধ্যে। প্রতি টন চালের দাম পড়ছে ৪৩৩ ডলার ৬০ সেন্ট। 

এছাড়া ছত্তিশগড়ের রায়পুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাগাদিয়া ট্রেডার্স এরই মধ্যে বেসরকারি খাত থেকে সংগ্রহের জন্য পরিকল্পিত ৫০ হাজার টন চাল সরবরাহের কাজ পেয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি টন চাল সরবরাহ করছে ৩৯৩ ডলার ৩০ সেন্টে।

বিষয়ে ভারতের স্থানীয় এক রফতানিকারক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, সরকারি কো-অপারেটিভ দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে টনপ্রতি অন্তত ৪০ ডলার বেশি মূল্যে সরবরাহ করছে। মূলত ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রফতানি বাজার ধরার প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে ওঠায় তারা মূল্য কমিয়ে একে অন্যের বাজার দখল করতে চাইছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে বর্তমানে বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এর সুযোগে ভারত থেকে চাল আমদানিতে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়িয়ে তুলেছে বাংলাদেশ। আবার আরেক প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের রেষারেষি থাকলেও দুই দেশের মধ্যেও নানা মাত্রায় চাল কূটনীতি বিরাজমান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ফোরামগুলোর সক্রিয়তার মাত্রা যেমনই হোক, খাদ্য বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একধরনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক সবসময়ই ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক . ইমতিয়াজ আহমেদ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, আমার মনে হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সার্ক না এগোনোর কারণ হলো যারা এটিকে পরিচালনা করেছেন তারা অর্থনীতির ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। কিন্তু সার্কভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য কাঠামো অনেকটা একই রকম। তাই এটি বেশি দূর এগোয়নি। অন্যান্য বিষয়ে জোর দিলে হয়তো এগোত। তবে সার্কের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একধরনের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন কমবেশি ছিল। সব দেশের মধ্যে হয়তো ছিল না, কিন্তু বেশির ভাগ দেশের মধ্যে একধরনের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভারতের সঙ্গে নেপাল বা বাংলাদেশের সঙ্গে নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকার একধরনের সম্পর্ক কমবেশি সবসময় ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আগেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বড় আকারে গড়ে ওঠেনি। আর সম্পর্ক যেমনই হোক খাদ্যের ক্ষেত্রে ধরনের দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো দক্ষিণ এশিয়ায় সবসময়ই ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক হোক নানাভাবে বাণিজ্য চালু ছিল। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ায় সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

আরও