মাদারীপুর-১

আওয়ামী ভোটের ওপরই নির্ভর করছে বিএনপি ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা

১৯৯১ সাল থেকে মাদারীপুর-১ আসন বরাবরই ছিল আওয়ামী লীগের দখলে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন প্রার্থীকে পছন্দ করে ভোট দেবেন, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ভোটের হিসাব। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা তিন প্রার্থীও আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের দিকে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর জেলার মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসন। এ আসনে বিজয়ী হতে হলে প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে মনে করেন এখানকার বাসিন্দারা। আসনটিতে এবার বিএনপির দুই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের প্রার্থী ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়েছেন।

এ আসনে ভোটারদের বিবেচনায় এগিয়ে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থী হলেন— বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের নাদিরা আক্তার, বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ ও স্বতন্ত্র জাহাজ প্রতীকের প্রার্থী কামাল জামান মোল্লা ও ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী।

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চান্দেরচর বাজারে এক চায়ের দোকানে বসে কথা হয় মধ্যবয়সী অন্তত কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। সবার মুখে কথা ছিল, আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি নেতাদের আশ্রয়ে এই আসনের ভোটের মাঠে অনেকটা প্রকাশ্যেই আছেন। তাই আওয়ামী লীগের ভোট যে প্রার্থী বেশি পাবেন, তিনিই জয়ী হবেন।

সাইফুল ইসলাম নামের চল্লিশ পেরোনো এক ভোটার বলেন, ‘ভোটের মাঠে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী তিনজনই তো বিএনপি করে। তবে দল থেকে যে মনোনয়ন পেয়েছে তার অবস্থা শুরুতে ভালো ছিল না। এখন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ও নেতারা তার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তিনজনই সমানে সমান অবস্থানে আছে। নির্বাচনে কে বিজয়ী হবে তা বলা এখন মুশকিল। সবার মধ্যে তুমুল লড়াই হওয়ার আভাসও দেখতে পাচ্ছি। আসনটিতে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা আছে ভোটারদের।‘

শেখপুর এলাকার ভোটার ফয়সাল আহমেদ বলেন, ’আমাদের এই এলাকায় বিএনপির কোনো নেতা ছিল না। এখন আওয়ামী লীগের নেতারা পদ ছাড়াই বিএনপির নেতা-কর্মী হয়ে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা করে যাচ্ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থীরা শক্ত অবস্থানে থাকায় তাদের কর্মী–সমর্থকেরাও বেশ উত্তেজিত। তাই ভোট সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে আমরা একটু আতঙ্কের মধ্যেই আছি।‘

শিবচর পৌর এলাকার ভোটাররা বলছেন, শুধু দলীয় প্রতীক নয়, ‘ব্যক্তি ইমেজও’ গুরুত্বপূর্ণ হবে এবারের ভোটে। মোতালেব হোসেন নামে শিবচর পৌর এলাকার একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘যে প্রার্থী সাধারণ মানুষের পাশে থাকবে, উন্নয়নের ধারা ধরে রাখবে, যার কাছে সহজেই সাধারণ মানুষ পৌঁছাতে পারবে, আমরা সে রকম একজন প্রার্থীকেই চাই। এখানে অধিকাংশ মানুষই আওয়ামী লীগের সমর্থক। এই ভোট এবার কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই যোগ্য মানুষ বাছাই করে ভোট দিতে হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা কোন প্রার্থীকে পছন্দ করে ভোট দেবেন, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ভোটের হিসাব। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা তিন প্রার্থীও আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের দিকে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন। সবশেষ প্রচারের শেষ দিনে ওই প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে বড় জনসভার আয়োজন করেছেন।

সম্প্রতি ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা ধানের শীষের প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। এ নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এরপরও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন।

বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত জেলা। এই জেলায় আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থক বেশি। এ আসনে আওয়ামী লীগের ভোট ছাড়া কোনো প্রার্থীই বিজয়ী হতে পারবেন না। এখানে বিএনপির নেতাদের আওয়ামীলীগের সমর্থকদের নিয়েই মিলেমিশে থাকতে হবে। তাই বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোট পেতে নেতাদের সামনে এনে প্রচার অভিযান শেষ করেছেন।

মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার বলেন, ‘শিবচরে বিএনপিকে বিজয়ী করতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করেছি। দলমত–নির্বিশেষে আমি সবাইকে পাশে রাখার চেষ্টা করেছি। সর্বস্তরের মানুষের কাছে আমরা ভোট প্রার্থনা করে প্রচার শেষ করেছি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমে শিবচরে বিএনপি জয়লাভ করবে বলে আমি আশা করছি।’

এদিকে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী কামাল জামান মোল্লার নির্বাচনী প্রচারে শেষ মুহূর্তে এসে যুক্ত হয়েছেন তার বড় ভাই আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লাসহ আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারণার পালে লেগেছে জোর হাওয়া।

কামাল জামান মোল্লা বলেন, ‘আমাকে বিএনপি থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েও ষড়যন্ত্র করে বাদ দেয়া হয়েছে। শিবচর উপজেলার জনগণ ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আমাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদে দেখতে চায়। তাই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাহাজ প্রতীকে নির্বাচন করছি। আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে আসনটি বিএনপিকেই উপহার দেব। আমি বিশ্বাস করি, শিবচরের মানুষ আমাকেই ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করবে।’

১৯৯১ সাল থেকে মাদারীপুর-১ আসন বরাবরই ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। ১৯৯৬ সাল থেকে আসনের সংসদ সদস্য হয়ে আসছেন নূর-ই আলম চৌধুরী। ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান পর্যন্ত সবই ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। বিএনপি বা অন্য কোনো দলের কার্যক্রম এ এলাকায় সেভাবে ছিল না। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চিত্র বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়।

এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা ওই তিন প্রার্থী ছাড়াও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য মনোনীত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আকরাম হুসাইন, গণ অধিকার পরিষদের রাজিব মোল্লা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আবদুল আলী, জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমরান হাসান নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তবে বিএনপি ও বিদ্রোহী দুই প্রার্থী ছাড়া অন্য প্রার্থীদের নির্বাচনী এলাকায় তেমন প্রচারণা নেই।

মাদারীপুর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিবচর পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-১ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২১ হাজার ১৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৮৭ জন। নারী ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪৪ জন।

আরও