কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষের হাতে এসেছে বাড়তি কাজের সুযোগ। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেন বাড়ায় আয়-রোজগারে স্বস্তি ফিরেছে উপকূলজুড়ে। চাঙ্গা হয়ে উঠেছে পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পোশাক ও স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বিপণিসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য। সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে পর্যটনকেন্দ্রিক এ জোয়ার সাগরপাড়ের অর্থনীতিকে করেছে আরো প্রাণবন্ত। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, এবার ঈদের ছুটিতে প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সৈকত ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা সমুদ্রসৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণীসহ প্রতিটি পয়েন্টে মনের মতো সময় কাটাচ্ছেন। সৈকতের আকাশে দীর্ঘ সময় ধরে ভেসে থাকা রংধনু, মেঘ সরে যাওয়ার পর দিনের শেষ বেলার মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত আর হিমেল হাওয়া পর্যটকদের ঈদ আনন্দ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সমুদ্রস্নান করছেন পানিতে, জেটস্কিতে চড়ছেন। সাগরের ধারে বাইক আর ঘোড়া রাইড করছেন। সৈকতের বালিয়াড়ি, নীল জলরাশি আর হাওয়ার মিলনে মুহূর্তগুলো যেন আরো আনন্দময় হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাছে।
ঢাকার আশুলিয়া থেকে আসা পর্যটক ইমরান খান বলেন, ‘পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে এই প্রথমবার কক্সবাজারে এসেছি। তাই ঈদের আনন্দটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আরো তিনদিন থাকব আশা করছি, এ সময়টাতে সব জায়গা ঘুরে আরো বেশি উপভোগ করতে পারব।’
কুমিল্লা থেকে আসা আব্দুল্লাহ বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে কক্সবাজার আসা স্বপ্নের মতো। সমুদ্র, পাহাড় আর সবুজ বন সব সত্যিই অসাধারণ।’ চট্টগ্রাম থেকে আসা মামুন-রুমি দম্পতি বলেন, ‘বিয়ের পর প্রথম কক্সবাজারে এসে খুব ভালো লাগছে। সমুদ্রসৈকতে শুনেছিলাম ঝুপড়ি দোকান ছিল, এখন দেখি একদম পরিষ্কার, অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে।’
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের এক মাস নিস্তব্ধ ছিল সাগরপার। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর ঈদের আনন্দ-দুই মিলিয়ে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর এখন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে মানুষের সমাগম। পর্যটকের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হস্তশিল্পের তৈরি শো-পিস, কোমর তাঁতের কাপড়সহ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর বেচাবিক্রিও জমে উঠেছে। পর্যটকবাহী গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। পর্যটকবাহী গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও অনেকটা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
তারকা হোটেল কক্স-টুডের জেনারেল ম্যানেজার আবু তালেব বলেন, ‘৩০ মার্চ পর্যন্ত হোটেলের প্রায় রুম বুকিং রয়েছে। রমজানে একদম পর্যটকবিহীন ছিল কক্সবাজার। এখন পর্যটক আগমনে ভরপুর হয়ে উঠেছে। কক্সবাজার হোটেল মোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ‘ঈদের পরদিন থেকেই পর্যটক কক্সবাজারে আসা শুরু করেছে। ঈদের পরদিন প্রায় এক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন। এ ধারা টানা প্রায় ১০ দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে পর্যটন খাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা আশা করা যাচ্ছে।’
এদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি টিম ও গোয়েন্দা টিম মাঠে সক্রিয় রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, ‘পর্যটকদের জন্য সাদা পোশাকে নজরদারি টিম ও গোয়েন্দা টিমের সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি টিম পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।’ সৈকতে কর্মরত বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছি। সৈকতে প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পর্যটকদের সতর্ক করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, পর্যটকরা সমুদ্রস্নান ও বিনোদন উপভোগ করতে পারেন। ঈদের দিন থেকে অনেকের ছুটি বাতিল হয়েছে।’
কক্সবাজার সি সেইফ লাইফ গার্ডের জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ঈদের এ ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসছে। আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল পতাকা দিয়ে সতর্ক করছি এবং পর্যটকদের নিরাপদে সমুদ্রস্নান নিশ্চিত করছি। পর্যটকদের সেবায় আমরা নিয়োজিত রয়েছি।’
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশও সমন্বিতভাবে কাজ করছে।’ কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে পর্যটন নগরীতে। এ লক্ষ্যে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় আর কোনো দোকান বসতে দেয়া হবে না। আমরা চাই পর্যটক এলাকায় বিশ্বমানের সৌন্দর্য ফিরে আসুক।’