নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে ধীরগতি

লক্ষ্মীপুরে এবার বর্ষায়ও ভাঙনের শঙ্কায় মেঘনাপাড়ের বাসিন্দারা

গত কয়েক বছর সাতবার মেঘনা নদীর ভাঙনে বাস্তুহারা হয়েছেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নাছিরগঞ্জ এলাকার মোসলেহ উদ্দিন মাঝি।

গত কয়েক বছর সাতবার মেঘনা নদীর ভাঙনে বাস্তুহারা হয়েছেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নাছিরগঞ্জ এলাকার মোসলেহ উদ্দিন মাঝি। কখনো অন্যের জমি, কখনো ঘর ভাড়া করে থেকেছেন পরিবার নিয়ে। সর্বশেষ নাছিরগঞ্জ নদীর পাড়েই ২০ শতাংশ জমি মৌখিকভাবে কিনে সেখানেই পরিবারের মাথা গোজার ঠাঁই করেছেন মোসলেহ উদ্দিন মাঝি। তবে প্রতিনিয়তই এক ধরনের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে।

মোসলেহ উদ্দিন মাঝি বলেন, ‘গত কয়েক বছর মেঘনা নদীর তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ চললেও কাজের গতি সামান্য। এতে এবার বর্ষায়ও ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

শুধু মোসলেহ উদ্দিন মাঝিই নন, সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ শেষ না হওয়ায় এবারের বর্ষায়ও মেঘনার ভয়াবহ ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস আতঙ্কে রয়েছেন কমলনগরের নাছিরগঞ্জ, নবীগঞ্জ, বাতির খাল ও মতিরহাটসহ উপকূলের বেশকিছু এলাকার বাসিন্দারা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে মাছঘাট ও বাজারসহ ফসলি জমি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সাল থেকে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার মেঘনার তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। নাছিরগঞ্জ, নবীগঞ্জ, বাতির খালসহ মেঘনার বিভিন্ন এলাকায় এখনো শেষ হয়নি জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ। এবারের বর্ষার আগে বাঁধের কাজ শেষ হচ্ছে না। তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণে আতঙ্কে রয়েছেন নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।

চুক্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করার কথা। তবে এখন পর্যন্ত জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনটেক কমিউনিকেশন লিমিটেড। ছয়টি প্যাকেজে ১৮০০ মিটার বাঁধ নির্মাণকাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইড ইঞ্জিনিয়ার মো. মনিরুল ইসলাম রানা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একদিকে জোয়ারের তীব্রতার কারণে তিন প্যাকেজের জিও ব্যাগ ডাম্পিং যাচ্ছে না। আবার বাকি তিন প্যাকেজে পানি কম থাকায় কাজ চালিয়ে যাওয়াও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবন্ধকতার মাঝেও আমরা যথাসাধ্য কাজ করছি।’

চুক্তির মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সামনে বর্ষার কারণে বাঁধ নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়বে। তাই চুক্তির মেয়াদও বাড়াতে হবে। বর্ষার পর বাঁধে ব্লক ফেলে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তবে বর্ষায় ভাঙন ঠেকাতে বালি ও জিও ব্যাগ ডাম্পিং চলমান রয়েছে। আশা করি, উপকূলের বাসিন্দারা কিছুটা রক্ষা পাবেন।’

নদী তীরের/ বাসিন্দারা বলছেন, গত ৩০ বছরে অসংখ্যবার মেঘনার ভাঙনের কবলে পড়েছে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল। নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি, মাছঘাট, বাজার, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ প্রায় ২৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এতে বাস্তুহারা হয়েছে উপকূলের লক্ষাধিক বাসিন্দা। প্রতি বছর বর্ষায় মেঘনার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। ভাঙন রোধে তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণে সরকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। তবে কাজের ধীরগতিতে এবারের বর্ষায়ও ভাঙন আতঙ্ক কাটছে না তাদের।

কমলনগরের চর লরেঞ্চ ইউনিয়নের নবীগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মেঘনার তীরে বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করছেন কিছু শ্রমিক। আবার চরমার্টিন ইউনিয়নের নাসিরগঞ্জ ও বাতির খাল এলাকায় নদীর পাড়ে বালি স্তূপ করে রেখেছেন ঠিকাদারের লোকজন। কিন্তু শ্রমিকদের কোনো নির্মাণকাজ করতে দেখা যায়নি। তবে এসব এলাকার স্থলভাগে ব্লক নির্মাণ করতে দেখা যায়। প্রতি বছর বর্ষায় জলোচ্ছ্বাস আর নদীভাঙনের কবলে পড়তে হয় এ এলাকার বাসিন্দাদের।

নবীগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী মো. বেল্লাল হোসেন বলেন, ‘একদিকে বন্যা, অন্যদিকে নদীভাঙন। দুর্যোগ আমাদের নিত্যসঙ্গী। সাতবার নদীতে ভেঙেছে নাছিরগঞ্জ বাজার। বাঁধ নির্মাণ হয়ে গেলে আমরা ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে রক্ষা পেতাম। কিন্তু প্রতি বর্ষায় বাজারে পানি ঢুকে দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। অন্যত্র মালামাল সরিয়ে নিতে হয়। বাঁধ নির্মাণ শুধু চলছেই, কিন্তু কোনো অগ্রগতি দেখছি না।’

একই বাজারের ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, ‘নবীগঞ্জ বাজারে বাঁধ দিলেই বারবার জোয়ারে ভেঙে নিয়ে যায়। এখন ঠিকাদার যে নির্মাণকাজ করছে, তা ধীরগতিতে চলছে। এক-দেড় মাস পর শুরু হবে বর্ষা। এবারের বর্ষায় আর রক্ষার সুযোগ নেই। অনেক পরিবার এ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এবার ভাঙলে এ বাজারের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ব্যবসায়ীদের আর কোনো গতি থাকবে না।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় রামগতি ও কমলনগর উপজেলার ৩১ কিলোমিটার নদীর তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণের ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৭ লক্ষ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। ৩৪টি প্যাকেজে প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৬টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ জামান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এরই মধ্যে মেঘনার তীরে জিও ব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম শেষ হয়েছে। অধিকাংশ স্থানে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে বাঁধ নির্মাণ শেষ না হওয়ায় ভাঙন আতঙ্ক রয়েছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে। বর্ষার আগে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ কাজ তদারকি করে যাচ্ছেন।’

আরও