২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন রাজনৈতিক দল ঘোষণা

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতারা ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেবেন। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া এভিনিউতে বেলা ৩টায় গণজমায়েতের মধ্য দিয়ে দলটি আত্মপ্রকাশ করবে।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতারা ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেবেন। জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন মানিক মিয়া এভিনিউতে বেলা ৩টায় গণজমায়েতের মধ্য দিয়ে দলটি আত্মপ্রকাশ করবে। জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গতকাল রাজধানীর বাংলা মোটরে নিজেদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান।

জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম নতুন এ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আসছেন। দল ঘোষণার আগেই সরকার থেকে পদত্যাগ করবেন তিনি। এছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বে থাকছেন আখতার হোসেন, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আলী আহসান জোনায়েদ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারোয়ার তুষার, আব্দুল হান্নান মাসউদ, আরিফুল ইসলাম আদীব, আরিফ সোহেল।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘ছাত্রদের রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ নিয়ে সারা দেশের মানুষের যে অপেক্ষা, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি তার অবসান হচ্ছে। দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও দলীয় স্বার্থের বাইরে গিয়ে আমাদের এ দলে কেবল দেশের স্বার্থকেই গুরুত্ব দেয়া হবে। আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, প্রবাসীদের প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। তাই আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে।’

এদিকে নতুন রাজনৈতিক দলের আহ্বায়ক কমিটির একটি খসড়া বণিক বার্তার হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, আহ্বায়ক কমিটিতে অন্যান্য আরো যারা থাকছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য সারোয়ার তুষার, ডা. তাসনিম জারা, ডা. তাজনভা জাবীন, সামান্তা শারমিন, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া, তারেকুল ইসলাম, আকরাম হোসাইন সিএফ, অনিক রায়, আতিক মুজাহিদ, অলিক মৃ, আব্দুল্লাহ আল আমিন, আলী নাছের খান, নাহিদা সারওয়ার চৌধুরী, আসাদ বিন রনি, ড. আতিক মুজাহিদ, নিজাম উদ্দীন, আতাউল্লাহ, মাহবুব আলম, সালেহ উদ্দীন সিফাত, ডা. মাহমুদা মিতু, খালেদ সাইফুল্লাহ, মনিরা শারমিন প্রমুখ। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে থাকছেন সোহেল আরিফ ও নুসরাত তাবাসসুম।

জানা গেছে, দলের মূল নেতৃত্বে আসছেন নাহিদ ইসলাম, যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ২৬ বছর বয়সী এ তরুণ নেতা ১৯৯৮ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তাকে দুবার আটক করা হয়। এ সময় তিনি অকথ্য নির্যাতনেরও শিকার হন। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত নাহিদ ইসলাম বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক এ শিক্ষার্থী প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আলোচনায় আসেন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্লাটফর্ম ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রসংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক তিনি। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর।

জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘দল গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে গত এক মাসে আমরা সারা দেশে একটি ক্যাম্পেইন চালাই। তাতে সব শ্রেণী-পেশার দুই লাখেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। তারা ক্যাম্পেইনে আমাদের জানিয়েছেন, দেশ গঠন করতে হলে এমন একটা রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন যারা দুর্নীতিমুক্ত ও পরিবারতন্ত্রের বাইরে এসে কাজ করে যাবে। মানুষ বিশ্বাস করে তাদের এসব পরামর্শ নতুন প্রজন্ম বাস্তবায়ন করতে পারবে।’

নবগঠিত দলের কাঠামো ও নেতৃত্ব সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আখতার হোসেন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের দলের নাম চূড়ান্ত হয়নি। সারা দেশের মানুষ যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে ৩০টির মতো নাম বিবেচনায় নিয়েছি। ২৮ তারিখে (ফেব্রুয়ারি) আমরা আহ্বায়ক কমিটির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করব। সেদিনই দলের নাম, কাঠামো এবং নেতাদের নাম আমরা জানাতে পারব।’

তিনি আরো বলেন, ‘নবগঠিত দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে দলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছে। সামনের দিনেও সদস্যদের সরাসরি ভোটেই এ দলটির নেতা নির্বাচন করা হবে।’

নতুন দলে নেতৃত্বে যারা থাকছেন তাদের মধ্যে সারজিস আলম অন্যতম। কোটা সংস্কার আন্দোলনের এ সমন্বয়ক ১৯৯৮ সালে পঞ্চগড়ে জেলার আটোয়ারী উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে জাতীয় নাগরিক কমিটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের পর ২০১৭ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। পরে সেখান থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে অমর একুশে হল সংসদে প্যানেল থেকে সদস্য পদে জয়লাভ করেছিলেন। তাছাড়া তিনি নানা পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিতার্কিক হিসেবে অংশ নেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তিনি পুলিশের হাতে আটক হন।

২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী৷ছিলেন। তিনি কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার থানায় জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে আন্দোলন করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী আলী আহসান জোনায়েদ। ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জে তার জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসিতে (আইআইএলডি) রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করছেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি বিতর্কসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে পুলিশের হামলায় আহত হন। ২০১৮ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সেক্রেটারি হিসেবে কোটা আন্দোলনে সহায়তা ও সক্রিয় অংশ নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় থাকার পাশাপাশি যাত্রাবাড়ী এলাকায় সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এর আগে ছাত্র ফেডারেশন এবং এবি পার্টির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ২০২০ সালে সীমান্ত হত্যা বন্ধে একাই রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদ বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এ শিক্ষার্থীর জন্ম নোয়াখালীর হাতিয়ায়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম সারির নেতারা যখন পুলিশ বাহিনীর কাছে আটক হন তখন তিনি হাল ধরেন। এর আগে তিনি ছাত্র অধিকার পরিষদ ও গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ শিক্ষার্থী ছাত্রজীবন থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। ঢাকায় এসে তিনি বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও রাষ্ট্র সংস্কার ও বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলে বুদ্ধিবৃত্তিক অ্যাক্টিভিজম করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে ছিলেন সরব। পেশাগত জীবনে তিনি একজন স্বাধীন গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করেন। বেশ কয়েকটি বইয়েরও রচয়িতা তিনি।

আরিফুল ইসলাম আদীব ছাত্র অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাজনৈতিক শুরু ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে। ২০১৯ সালে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ আন্দোলনের সংগঠক ছিলেন। আদীব রাজনৈতিক দল গণঅধিকার পরিষদের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও প্রতিষ্ঠাকালীন সংগঠক ছিলেন। ২০১৯ সালে ডাকসুর ভবনে ছাত্রলীগের হামলায় দুই কিডনি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তাকে ডায়ালাইসিসে যেতে হয়। হারাতে বসেন চোখের দৃষ্টিশক্তিও। অভ্যুত্থানের সময় দায়িত্ব পালন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে। জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠনের সংগঠক হিসেবেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

পেশাগত জীবনে ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালের পর থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট ও মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে জন্ম নেয়া আদীব ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও