রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দুই এলাকা মোহাম্মদপুর ও মিরপুর। নানা ধরনের ব্যবসা ও কর্মকাণ্ডকে ঘিরে গড়ে উঠছে স্থানীয় প্রভাব বলয়। বাসস্ট্যান্ড ও পরিবহনকেন্দ্রিক ব্যবসা, ঝুটের কারবার, কাঁচাবাজার, ফুটপাতের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে আবাসিক ভবন ও জমি-বাড়ির দখল—বিভিন্ন খাতেই আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা রয়েছে স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলোর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আধিপত্য ধরে রাখতে কোথাও কোথাও ভাড়াটে সন্ত্রাসী ব্যবহার এবং প্রকাশ্যে হামলার ঘটনাও ঘটছে। সময়ের সঙ্গে এসব অপরাধী চক্রের তৎপরতা ও প্রভাব বলয় বিস্তৃত হওয়ায় চাপ বাড়ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর।
মোহাম্মদপুরের বাসস্ট্যান্ড, বাজার ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ছোট-বড় ব্যবসা এবং দৈনন্দিন লেনদেনের পরিমাণ অনেক। তাই পরিবহনকেন্দ্রিক আয়, ফুটপাতের দোকান, কাঁচাবাজার ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে এক পক্ষের সঙ্গে আরেক পক্ষের বিরোধ। কোথাও দোকান বসানো, কোথাও জায়গা দখল, কোথাও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ঘিরে বিরোধ সংঘাতেও রূপ নিচ্ছে।
রাজধানীর মিরপুরেও একই ধরনের প্রবণতা। বিশেষ করে ঝুট ব্যবসা, পরিবহন, শাহ আলী কাঁচাবাজার, ফুটপাতের ব্যবসা ও আবাসিক এলাকার জমি-বাড়িকে ঘিরে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আধিপত্যের প্রতিযোগিতা রয়েছে। প্রান্তিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির এসব খাতে নগদ লেনদেন বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক কাঠামোও দুর্বল। ফলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কিশোর ও তরুণদের বিভিন্ন গ্রুপ।
পুলিশের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকায় বড় ধরনের দখল ও লুটপাটের ১০টি ঘটনার মধ্যে আটটিই সংঘটিত হয়েছে মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে। গত ৩০ এপ্রিল রাতে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানার আওতাধীন বাইগারটেক এলাকায় ২৮ কাঠা জমির ওপর নির্মিত পাঁচটি ঘর দখল করে নেয় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। ৯ মে সকালে মিরপুরের রূপনগরের দুয়ারিপাড়া এলাকায় শতকোটি টাকা মূল্যের জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমি দখলে চলে যায়। চাঁদা না পেয়ে গত ২৯ জুলাই মিরপুর সাগুফতা হাউজিং এলাকায় এক্সক্যাভেটর দিয়ে বাড়ি ভেঙে পাঁচ কাঠার প্লট দখল করে নেয় সন্ত্রাসীরা। একটি ফাঁকা জমি দখল করা নিয়ে ২৯ আগস্ট পল্লবীতে বিহারি ক্যাম্পে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এছাড়া সেপ্টেম্বরে আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের একটি বাড়ি দখল করতে গিয়ে হামলা ও মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে জমি দখল নিতে গিয়ে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এ দুই এলাকার অপরাধচিত্রকে আরো জটিল করে তুলছে। শুরুতে ছোটখাটো ঝামেলা, মারামারি, মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া কিংবা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনায় যাদের দেখা যেত, তাদের একটি অংশ এখন বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ। স্থানীয় বিরোধ মেটানো, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা জমি-বাড়ি নিয়ে বিরোধে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও কিশোর-তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে বসবাস করেন প্রবীণ বাসিন্দা ইউসুফ শেখ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধ জগতের ইতিহাস বহু পুরনো। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্য, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও দখলকে ঘিরে সংঘাত ছিল আলোচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই পুরনো কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিশোর গ্যাং ও ছোট ছোট অপরাধী গ্রুপ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতি যেন নতুন মাত্রা পায়। পুলিশি কার্যক্রমে দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের একের পর এক ঘটনা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় গত বছর ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী থানার সামনে বিক্ষোভ পর্যন্ত করে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধের অর্থনীতির সঙ্গে এ গোষ্ঠীগুলোর যোগসূত্রও গুরুত্বপূর্ণ। ছিনতাই ও মাদক কারবার সরাসরি অর্থ আয়ের পথ তৈরি করে। আবার চাঁদাবাজি ও দখলদারির মতো অপরাধে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি ‘আয়’ নিশ্চিতের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে অপরাধী গোষ্ঠীর কাছে তরুণদের ব্যবহার কেবল ভয় দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং তাদের একটি অংশকে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ফুটপাতে অস্থায়ী দোকানপাট
জমি ও বাড়ির দখলকে ঘিরে সংঘাত এ দুই এলাকার অপরাধচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগরায়ণের ফলে জমির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিরোধপূর্ণ জমি, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, মালিকানাবিহীন বা দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলা সম্পত্তি দখলের চেষ্টা থেকে সংঘাতের সূত্রপাত হচ্ছে। কোথাও মালিকানা নিয়ে বিরোধ, কোথাও ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, আবার কোথাও ভবন নির্মাণ বা জমির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি হচ্ছে পক্ষগুলো। এসব ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাশাপাশি ভাড়াটে সন্ত্রাসী ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। তাই ভাসমান মানুষের আধিক্য নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর বৈধ আয়ের পথ তৈরি ছাড়া এ দুই এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণতা কমাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি এসব এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নও জরুরি। বেকারত্ব, স্বল্পশিক্ষা ও নানা সামাজিক ঝুঁকির কারণে অনেকের মধ্যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসাজশ, মাসোহারা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগগুলো কঠোরভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ, জবাবদিহি নিশ্চিত এবং অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করতে হবে। মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী কর্মহীন ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও কাজ করতে হবে সমন্বিতভাবে।’
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরের বছিলা, চাঁদ উদ্যান ও রায়েরবাজার এলাকায় বিপুলসংখ্যক ভাসমান জনগোষ্ঠীর বসবাস। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব মানুষ এলাকার নানা অস্থায়ী স্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছেন। তাদের অনেকের তথ্য নাগরিক ডেটাবেজে নেই। পরিচয় ও বসবাসের তথ্যের এ ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে এসব জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে আবাসন প্রকল্পের জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান।
মোহাম্মদপুরে অপরাধ বিস্তারের পেছনে এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বছিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, নবীনগর হাউজিং, বেড়িবাঁধ ও জেনেভা ক্যাম্পজুড়ে রয়েছে ঘনবসতি, সরু গলি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার মিশ্রণ এবং একাধিক দিকে বের হওয়ার পথ। ফলে কোনো অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত স্থান পরিবর্তন বা আত্মগোপনের সুযোগ পায় অপরাধীরা। বিশেষ করে বেড়িবাঁধ হয়ে উঠেছে পালিয়ে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এ পথ ব্যবহার করে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ও আবাসিক অঞ্চলে দ্রুত সরে যাওয়ার সুযোগ থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও জটিল হয়ে পড়ছে।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণতার অন্যতম কারণ জেনেভা ক্যাম্পের উঠতি বয়সী স্কুলছুট ও বেকার যুবসমাজ। পাশাপাশি বছিলা, রায়েরবাজার ও চাঁদ উদ্যানে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অনেক ভাসমান মানুষ বসবাস করেন; যাদের বড় একটি অংশের তথ্য নাগরিক ডেটাবেজে নেই। তারা বিভিন্ন গ্যারেজ ও অস্থায়ী স্থাপনায় থাকে। নতুন আবাসন প্রকল্পগুলোয় জমি নিয়ে বিরোধের সুযোগে এসব ভাসমান জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করে সহিংস অপরাধ সংঘটনের ঘটনাও ঘটে। ভৌগোলিক অবস্থানও অপরাধীদের কিছুটা সুবিধা দেয়। পাশেই নদী ও চরাঞ্চল থাকায় অপরাধ করে দ্রুত কেরানীগঞ্জ বা সাভারের দিকে চলে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি উল্লেখ করে পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘তা সম্ভব না হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় এনজিওগুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে এলাকায় সিসি ক্যামেরা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও জরুরি।’
মোহাম্মদপুরের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরের অপরাধ চিত্রও কম উদ্বেগের নয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে পল্লবী, রূপনগর, শাহ আলী, কাফরুল, দারুস সালাম ও মিরপুর মডেল থানা এলাকায় বিস্তৃত জনবসতি ও বিপুল মানুষের বসবাস। এ কারণে ওই অঞ্চলে পুলিশের জন্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণও বেশ কঠিন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের হিসাবে, রাজধানীতে বর্তমানে ১২২টি সক্রিয় অপরাধী চক্র রয়েছে। এসব চক্রের সংখ্যার দিক থেকে মিরপুর শীর্ষে। এ অঞ্চলের অপরাধ জগতে বড় একটি আতঙ্ক স্থানীয় কিশোর গ্যাং। তুলনামূলক কম বয়সী এসব কিশোর-তরুণ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, হামলা, জমি দখল এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও বিভিন্ন ঘটনায় উঠে এসেছে।
মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনাও এ এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ওই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক লোক অংশ নেয়, যা সংঘবদ্ধভাবে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আনে।
মিরপুরের অপরাধ বিস্তারে গণপরিবহনকেন্দ্রিক এলাকাগুলোরও ভূমিকা রয়েছে। গাবতলী বাস টার্মিনালসহ মিরপুরের বিভিন্ন গণপরিবহন ডিপো ও আশপাশের এলাকায় ভাসমান অপরাধীদের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। এসব স্থানে মাদক কারবার, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আনাগোনা রয়েছে বলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব চক্রের সদস্যরা আরো গুরুতর অপরাধ, এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, মিরপুরের শিল্পাঞ্চল ও বিভিন্ন কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণও অপরাধের আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কারখানা থেকে উৎপন্ন ঝুটের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও ব্যবসা নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। ফলে কিশোর গ্যাং, ভাসমান অপরাধী ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও মিরপুরের অপরাধের বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করছে।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মিরপুর ডিএমপির শেষ প্রান্ত। এর পরই ঢাকা জেলার শুরু, মাঝখানে রয়েছে একটি নদী। এ ভৌগোলিক অবস্থান অপরাধীদের কিছুটা সুবিধা দেয়। নদীপথ ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার সুযোগ থাকে। মিরপুরে বড় একটি বাস টার্মিনাল ও গণপরিবহনের বেশ কয়েকটি ডিপো রয়েছে। ফলে এখানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও ভাসমান মানুষের বসবাসও তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকায় ঝুটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অপরাধের ঘটনা ঘটে। বিহারি ক্যাম্পকেন্দ্রিক কিছু অপরাধও রয়েছে। সব মিলিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বেকারত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থান—এ তিনটি বিষয় মিরপুরের অপরাধপ্রবণতার অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করছে।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে অপরাধের চরিত্রও বদলাচ্ছে। আগে যেসব অপরাধ মূলত রাস্তা, বাজার বা পরিবহনকেন্দ্রিক ছিল, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সম্পত্তি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বিষয়। প্রকাশ্যে হামলা, অস্ত্র প্রদর্শন, দলবদ্ধভাবে এসে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাস যেখানে বেশি, সেসব এলাকায় অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। এসব এলাকায় কর্মহীন ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ততাহীন মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের একটি অংশ জীবিকা নির্বাহের জন্য অপরাধকে বেছে নেয়। বৈধ আয়ের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাবে অনেকে তা কাজে লাগাতে পারে না। অপরাধী চক্রগুলো মূলত এ জনগোষ্ঠীকেই টার্গেট করে বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত করছে, যা সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’
পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির পাশাপাশি সরকারকে এসব মানুষের বৈধ কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরিতে জোর দিতে হবে বলে মনে করেন এ অপরাধ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক অনুশাসন ও সচেতনতার সংস্কৃতি। তা না হলে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অপরাধে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়বে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় চ্যালেঞ্জ আরো জটিল হবে।’