আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অনেক মেধাবী। এর একটা বহিঃপ্রকাশ দেখেছি আমরা জুলাই-আগস্টে। তারা এতটাই নিবেদিত ও সংকল্পবদ্ধ যে প্রতিভাদীপ্তভাবেই তারা বিষয়টিকে (গণ-অভ্যুত্থান) সম্ভব করেছে। স্লোগানকে তারা অস্ত্রে পরিণত করেছে। কী সুন্দর সুন্দর স্লোগান তারা নিয়ে এল, যেগুলো দিয়ে তারা মেশিনগান ও ট্যাংককে প্রতিহত করেছে। এর মাধ্যমে তারা পুরো জাতিকে একত্র করে নিয়ে এসেছে।
এত মেধাবী শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, তখন শুরুতেই আমরা তাদের দারুণভাবে বঞ্চিত করি। একজন শিক্ষার্থীর প্রথমেই দরকার একটি আবাসিক জায়গা বা হল। সে হলগুলোয় প্রাধ্যক্ষ বা আবাসিক শিক্ষকরা সিট বরাদ্দ করতেন না। গুটিকয়েক নেতা দাস-দাসীর মতো খাটার বিনিময়ে তাদের হলে থাকতে দিতেন। নেতারা যখন বলবে, তখনই মিছিলে আসতে হবে। যখন বলবে মিটিংয়ে অংশ নিতে হবে। তার পরদিন হয়তো পরীক্ষা। এর পরও তাকে সেখানে যেতে হবে। এ অবস্থা থেকে আমরা ফিরে এসেছি। এখন সিট বরাদ্দ হচ্ছে মেধার ওপর ভিত্তি করে।
একই সঙ্গে এটিও সত্য যে আমাদের শিক্ষার্থীরা যেমন অনেক মেধাবী, তাদের অনেকের পিতা-মাতা অনেক গরিব। তারা গর্ব করে বলে যে আমার বাবা কৃষক, রিকশাচালক, নৈশপ্রহরী ইত্যাদি। অনেক মেয়ে আসে, যাদের পরিবার থেকে সহযোগিতা পর্যন্ত দিতে পারে না। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থাকার জায়গা পাচ্ছে না। তাদের জন্য কি কিছুই করার নেই আমাদের? অবশ্যই আছে।
আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে মেয়েগুলোর থাকার ব্যবস্থা নেই তাদের প্রায় বিনাসুদে ঋণ দেয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা বিশ্বব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেছি। এখানে আমরা সহযোগিতার হাত অবশ্যই বাড়িয়ে দেব। শিক্ষার্থীদের মনোভাবকে শ্রদ্ধা জানানোই হলো শিক্ষকতার সবচেয়ে ভালো দিক।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেক কথা হয়। আমরা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পয়সা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলব, এটা উচিত না। তাদের ওপর যত কম চাপানো যায়, সে চেষ্টা করতে হবে আমাদের। সমাজ আমাদের কিছু দিয়েছে, এখন আমাদের সময় এসেছে এর প্রতিদান দেয়ার। সমাজের প্রতি আমাদের অনেক দায়বদ্ধতা আছে। অ্যালামনাইদেরও অনেক দায়িত্ব। তাদেরও অনেক দায়বদ্ধতা আছে। এখন তাদের এগিয়ে আসা উচিত।
শিক্ষা উপদেষ্টা একটি দারুণ ধারণা দিয়েছেন। ইউজিসিকে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন না বলে ইউনিভার্সিটি কমিশন অথবা উচ্চ শিক্ষা কমিশন বলা যায় কিনা সে বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এটি একটি অসাধারণ ধারণা। এর মাধ্যমে আমরা সরকারের প্রতি নির্ভরশীলতা কমাতে পারব। কমিশন কি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মতো করে দেখবে, নাকি সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে? আমরা অবশ্যই শ্রদ্ধামূলক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাব।
বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক উন্নত মানের কাজ করছে। তবে সব বিষয়ে নয়। কোনোটি একটি বিষয়ে তো আরেকটি অন্য বিষয়ে। গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এগিয়ে যেতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করতে চায়, আমরা এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখব।
গবেষণা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান যদি জাতীয় স্তরের হয়ে থাকে, এদের লক্ষ্য হবে নিজেদের আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়া। সমাজের সমস্যা ও চাহিদাগুলোকে অবশ্যই গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের রাস্তা বের করতে হবে। গবেষণা খুবই ব্যয়বহুল। এক্ষেত্রে সরকার ও ইউজিসিকে এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করছি। ফেব্রুয়ারিতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হবে। এরপর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও আমাদের সম্পৃক্ততা আসবে। অবশ্যই আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই কাজ করা উচিত। ইউজিসি শুধু পাঁচ সদস্য ও এক চেয়ারম্যানের একটা ছোট দল। সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলেই আমাদের বড় দল। আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাব।
—ড. এস এম এ ফায়েজ, চেয়ারম্যান, ইউজিসি