ইস্টার্ন রিফাইনারি

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের মেগা প্রকল্প অনুমোদন

জাম্বিয়াতে একই সক্ষমতার তেল শোধনাগার অর্ধেক ব্যয়ে নির্মাণ করছে চীনা কোম্পানি

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর। ওই সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেয়া হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর। ওই সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘এখন থেকে মেগা প্রকল্প না নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেয়া হবে।’ তার এ বক্তব্যের পর সরকারের একাধিক উপদেষ্টাও বিভিন্ন সময় বৃহৎ ও ব্যয়বহুল প্রকল্প না নেয়ার পক্ষে কথা বলেন। যদিও এরপর বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত একনেক সভায়ও পাস হয়েছে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। এতে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ভোটের আগে এত বড় অংকের প্রকল্প অনুমোদন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই বিতর্কিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে জ্বালানি তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয়ের তুলনায় ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রকল্প বাস্তবায়নে যে খরচ ধরা হয়েছে তা অনেক বেশি বলেও মনে করেন তারা। প্রকল্প পরিকল্পনা ও ব্যয় নিরূপণের স্বচ্ছতা নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।

দৈনিক ৬০ হাজার ব্যারেল সক্ষমতার একটি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার নির্মাণে চীনা কোম্পানি ফুজিয়ান শিয়াং শিন করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে জাম্বিয়া সরকার। দক্ষিণ-মধ্য আফ্রিকার দেশটির কপারবেল্ট প্রদেশের এনডোলা শহরে এ পরিশোধনাগার নির্মাণের কাজ গত জুলাইয়ে শুরু হয়েছে। প্রকল্পটিতে ব্যয় হচ্ছে ১১০ কোটি (১ দশমিক ১ বিলিয়ন) ডলার। স্থলবেষ্টিত দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করবে প্রতিবেশী তানজানিয়ার সমুদ্রবন্দর। সেখান থেকে সরাসরি রিফাইনারিতে নিয়ে গিয়ে তা প্রক্রিয়াকরণ করবে জাম্বিয়ার জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (আইডিসি)। তেল পরিশোধনাগারের সঙ্গে এলপিজি বোতলজাত ইউনিট, বিটুমিন উৎপাদন, লুব্রিক্যান্ট ব্লেন্ডিং সুবিধাসহ ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে জাম্বিয়া সরকার।

আফ্রিকার আরেক দেশ অ্যাঙ্গোলা গত সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যিকভাবে কাবিন্দা জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারে উৎপাদন শুরু করেছে। প্রথম ধাপে দৈনিক ৩০ হাজার ব্যারেল ডিজেল ও জেট ফুয়েল উৎপাদন দিয়ে শুরু হলেও সেটি ৬০ হাজার ব্যারেল সক্ষমতায় উন্নীতের কাজ চলছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জেমকর্প ও অ্যাঙ্গোলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সোনাঙ্গোলের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কাবিন্দা পরিশোধনাগার প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর জন্য প্রথম ধাপে ব্যয় হয় ৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে ৬০ হাজার ব্যারেল সক্ষমতায় নিয়ে যেতে ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি ব্যয় হবে। ২০১৯ সালে চুক্তি সই হলেও প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় মূলত ২০২১ সালে।

বাংলাদেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডকেও (ইআরএল) প্রায় একই সক্ষমতার করা হচ্ছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকার বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রতি ডলারের সর্বশেষ বিনিময় হার ১২২ টাকা ৫৫ পয়সা ধরে সে হিসাব দাঁড়ায় ২৮৯ কোটি (২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন) ডলার। তবে প্রকল্পটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জাম্বিয়া ও অ্যাঙ্গোলায় যে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার তুলনায় ১৩৯ শতাংশ বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে ইআরএলে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান সক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব মতে, দৈনিক পরিশোধন হচ্ছে ৩৩ হাজার ব্যারেল জ্বালানি তেল। এটিকে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করা হলে ২০৩০ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় এক লাখ ব্যারেল পরিশোধন সক্ষমতা তৈরি হবে। সে হিসাবে অতিরিক্ত সক্ষমতা বাড়বে আরো ৬৬ হাজার ব্যারেল, বার্ষিক ৪৫ লাখ টন। প্রায় একই সক্ষমতার একটি রিফাইনারি নির্মাণে জাম্বিয়ার ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি (১ দশমিক ১ বিলিয়ন) ডলার। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে মেগা প্রকল্পের অনুমোদন এবং এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে ২০১২ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। শুরুতেই এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। বতর্মানে একই প্রকল্পের ব্যয় ৪০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায় অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর কাজ শুরু না হলেও প্রকল্পের পরামর্শক, প্রস্তাবনা তৈরিসহ এরই মধ্যে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে জ্বালানি বিভাগ। নকশা তৈরিতে ফ্রান্সের কোম্পানি টেকনিপ এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে। মূলত এ দুটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিপিসির বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। অভিযোগ ছিল, বেসরকারি খাতে রিফাইনারির সুযোগ করে দিতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারির কাজ নিয়ে ঢিলেমি করে।

জানা গেছে, ইআরএল প্রকল্পটিতে পিএমসি হিসেবে ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল চুক্তি করে বিপিসি। বিনা দরপত্রে এ প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেয়ার নেপথ্যে সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বড় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দেশের জ্বালানি খাতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া নিয়ে ওই সময় সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে জানা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রতি নির্মাণ কার্যক্রম চলা ও উৎপাদনে আসা ৬০-৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের পরিশোধনাগার নির্মাণ ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ কাজে যে ব্যয় ধরা হয়েছে তুলনামূলকভাবে তা অনেক বেশি। যদিও জ্বালানি ও বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণে বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হয়েছে। তবে আধুনিকায়ন ও ডলারের বিনিময় হারের কারণে খরচ কিছুটা বেড়েছে বলেও তারা জানান।

জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয় যেটা ধরা হয়েছিল, সেখান থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। আরো ৫০০ কোটি টাকা এ প্রকল্প থেকে কমিয়ে আনা যায় কিনা সেটা দেখা হচ্ছে। তবে বর্তমানে যেটা একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে এটা একটা সম্ভাব্য ব্যয়। আমরা উন্মুক্ত দরপত্রে যাব। সেখানে আরো কম ব্যয়ে কোম্পানি পেতে পারি। এখানে মূলত ডলারের এক্সচেঞ্জ রেট বেশি হওয়ার কারণে খরচটা বাড়ছে। তবে অন্যান্য অনেক দেশের সঙ্গে তুলনামূলক খরচ বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সেখানে রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয় কোথাও কম আছে, আবার কোথাও বেশিও রয়েছে। আমাদের রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ বিবেচনায় বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ড ব্যয় হিসাব করা হয়েছে।’

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এ ধরনের মেগা প্রকল্প কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যখন বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।

রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যয়বহুল ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনও প্রশ্ন তোলে। সরকারের এ সংস্থাটির মতামতে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে যখন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, তখন দেশে এ ধরনের জটিল প্রযুক্তি ও বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প প্রস্তাবের যৌক্তিকতা আলোচনা করা যেতে পারে। এছাড়া এ প্রকল্পে কোন ধরনের ক্রুড অয়েল ব্যবহার করা হবে, মূল্য বিবেচনায় এ প্রযুক্তি কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে আলোচনারও পরামর্শ দেয় কমিশন।

প্রকল্পটিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে থোক বরাদ্দ হিসেবে ১১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এসব স্থাপনায় কী কী নির্মাণ করা হবে তা আরো পরিষ্কারভাবে আলোচনা প্রয়োজন। এছাড়া ইপিসি ঠিকাদার বৈদেশিক খরচ ৪৭ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, এসব ব্যয়ের যৌক্তিতা ও লক্ষ্য আরো পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি অনেক বছর ধরে ঝুলে ছিল। শুরুতে যখন উদ্যোগ নেয়া হয় তখনই করা গেলে অনেক কম ব্যয়ে বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। বিগত সরকারের সময় থেকে বৈদেশিক ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অনেক দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করেও অর্থ পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বিভিন্ন খাতের ব্যয় কমিয়ে আনা হয়েছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় এবং এটার যথাযথ ব্যবহার ও বাজার তৈরির বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, সারা বিশ্ব এখন রিফাইনারি থেকে সরে আসছে। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট বিবেচনায় বর্তমানে রিফাইনারি প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর যৌক্তিকতা নিয়ে আরো বিশদ আকারে আলোচনার দরকার রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিশেষত ডিজেলের চাহিদা বিবেচনায় রিফাইনারি নির্মাণে যাচ্ছে। তবে এ ধরনের প্রকল্পের ব্যবহার পুরোপুরি কতটুকু করা যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ রিফাইনারি ৪০ শতাংশ ডিজেল পরিশোধন করবে। বাকি ৬০ শতাংশ হয়তো পেট্রল, অকটেন কিংবা জেট ফুয়েল। আমরা পেট্রল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাহলে পেট্রলের বাজার কী হবে, অন্যান্য প্রডাক্ট মার্কেট আছে কিনা? সে বিষয়গুলো আরো ভালো স্টাডি হওয়া দরকার। যদি বাজার তৈরি করা না যায়, তাহলে ঝুঁকি তৈরি হবে পরিশোধন করা তেল কোথায় বিক্রি হবে, সেটা নিয়ে।’

ফ্রান্সের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেকনিপের অধীনে ১৯৬৮ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এর দ্বিতীয় ইউনিটের (ইআরএল-২) পরিকল্পনা করা হয়। শুরুতে এ প্রকল্পের বরাদ্দ দেয়া হয় ৭ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে ব্যয় বাড়িয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকায় অনুমোদন দেয়া হয়। তবে বিদেশী ঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পটির কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে কাজটি এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়; তখন প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ২৩ হাজার কোটি টাকা। তারপরও কাজ শুরু করা যায়নি।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানি ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইআরএল-২ নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করে; ৯ জুলাই জ্বালানি বিভাগ সে প্রস্তাব অনুমোদনও করে। তবে আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় উদ্যোগ নেয়। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫০১ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এবং বাকি ১০ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

বিদেশী ঋণ নিশ্চিত না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সংশোধিত পরিকল্পনা নেয়। পরিকল্পনা কমিশন ব্যয় কমানোর আগে প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ হাজার ৯৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩০ হাজার ৪৯৯ কোটি ৮০ লাখ এবং বিপিসির ১২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা।

প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয়ের বিষয়টি অন্যান্য দেশের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেসব ব্যয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ ধরনের রিফাইনারি ব্যয় অন্যান্য দেশের রিফাইনারির কাছাকাছি। তবে সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ডলারের এক্সচেঞ্জ রেটের কারণে প্রকল্পে খরচ বেড়েছে। এর আন্তর্জাতিক দরপত্র হবে। এমন নয় যে এটা কাউকে সরাসরি দিয়ে দেয়া হচ্ছে।’

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার ছিল ৬৭ লাখ টন। এর মধ্যে ইআরএল উৎপাদন করেছে কেবল ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। বাকি প্রায় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়েছে।

দেশে গত কয়েক বছরে জ্বালানির চাহিদা বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। বিপিসির প্রাক্কলন অনুসারে, ২০২৯-৩০ অর্থবছর নাগাদ সে চাহিদা ১ কোটি ৭ লাখ ৯০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে, যেখানে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টনে সীমাবদ্ধ থাকবে।

আরও