সড়কের মানোন্নয়নে কয়েক বছর ধরে অগ্রগতি হলেও সে ধারায় ছেদ পড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) সড়ক নেটওয়ার্কে ভাঙাচোরা অংশের হার বেড়েছে ২ শতাংশের বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জরিপে তা বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সওজের হাইওয়ে ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্টের (এইচডিএম) জরিপ অনুযায়ী, ২১ হাজার ১৩০ দশমিক ২৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২ হাজার ২৩০ কিলোমিটার এখন ভাঙাচোরা। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি চট্টগ্রাম অঞ্চলে, যেখানে প্রতি পাঁচ কিলোমিটার সড়কের এক কিলোমিটারেরও বেশি ভাঙাচোরা। এসব মেরামতে পাঁচ বছরে সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন বলে সওজ জানিয়েছে।
সওজের সড়ক নেটওয়ার্কের মান নির্ধারণে পরিচালিত এ জরিপে সড়কের অবস্থা পাঁচ শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। শ্রেণীগুলো হলো ভালো, চলনসই, দুর্বল, খারাপ ও খুব খারাপ। শেষ তিন শ্রেণীর সড়ককে ভাঙাচোরা হিসেবে ধরা হয়েছে।
সড়কের ধরন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা সড়ক। জরিপকৃত ১১ হাজার ৭৭৯ দশমিক ২০ কিলোমিটার জেলা সড়কের মধ্যে ১ হাজার ৪৪৩ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার, অর্থাৎ ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ ভাঙাচোরা। ৪ হাজার ৩০১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের ৩৯৫ দশমিক ২০ কিলোমিটার (৯ দশমিক ১৯ শতাংশ) ও ৫ হাজার ৪৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের ৩৯১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার (৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ) ক্ষতিগ্রস্ত।
বিগত বছরগুলোর জরিপে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সওজের নেটওয়ার্কের ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ সড়ক ভাঙাচোরা ছিল। নিয়মিত সংস্কার ও উন্নয়নকাজের ফলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ২৬ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হার আরেকটু কমে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ হলেও সর্বশেষ জরিপে তা আবার বেড়েছে। ফলে সড়কের মানের অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে ভাঙাচোরা অংশ মেরামতে আগামী পাঁচ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৬৫২ কোটি ৭৯ লাখ টাকার চাহিদা তুলে ধরেছে সওজ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে, ৮ হাজার ৮২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। পরের অর্থবছর ২০২৭-২৮-এ চাহিদা কমে দাঁড়াবে ৩ হাজার ৪১১ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৭৭ কোটি ৮৩ লাখ, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৯৪ কোটি ২১ লাখ ও ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম জোন। এ অঞ্চলের ২ হাজার ৭৩ দশমিক ৯১ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৪৪৫ দশমিক ৩২ কিলোমিটার ভাঙাচোরা। এরপর রয়েছে কুমিল্লা জোন, যেখানে ভাঙাচোরা সড়কের হার ১২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। খুলনা ও সিলেট জোনে এ হার যথাক্রমে ১০ দশমিক ৮৮ ও ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে রংপুর জোন। এ অঞ্চলের ২ হাজার ১৭ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১১৮ কিলোমিটার, অর্থাৎ ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ ভাঙাচোরা।
সড়ক কেন নষ্ট হচ্ছে তা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে মনে করেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, নাকি জলাবদ্ধতা—কোন কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা শনাক্ত না করে শুধু মেরামত করলে সমস্যার সমাধান হবে না। বর্ষার অন্তত দুই মাস আগে পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কার করা, জলাবদ্ধতাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা এবং বৃষ্টির সময় দ্রুত পানি সরানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ ধরনের আগাম প্রস্তুতিকে প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ বলা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি বর্ষার পর সড়ক মেরামতে ৪-৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ আগাম ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে এ ব্যয়ের বড় একটি অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। শুধু নতুন নীতি বা বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি।’
সড়কের মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ইন্টারন্যাশনাল রাফনেস ইনডেক্সের (আইআরআই) মাধ্যমে সড়কের অসমতলতা ও যান চলাচলের সময় ঝাঁকুনির মাত্রা মাপা হয়। এ সূচকের মান যত বেশি, সড়কের অবস্থা তত খারাপ। সওজের জরিপেও এ মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে।
সর্বশেষ অর্থবছরে সড়কের মান খারাপ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমরা বরাদ্দের পুরো অর্থ খরচ করতে পারিনি। সে সময় সরকার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ইস্যুর কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছে। ওই বছর আমাদের বরাদ্দ ছিল ২৬০ কোটি টাকা, খরচ করতে পেরেছি ১০৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেসব সড়ক মেরামতের কথা ছিল, তার অনেক কাজ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে শুরু হয়েছে। সেসব কাজ এখন চলছে। আশা করছি আগামী বছর পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’