সাধারণ অলিম্পিকে বাংলাদেশের ব্যর্থতা এক বাস্তবতা। তবে স্পেশাল অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ক্রীড়াবিদরা একের পর এক সাফল্য অর্জন করে চলেছেন। সাফল্যের ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকলেও তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নেই বললেই চলে। ঢাকার সাভারে প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা পরে বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নকশাজনিত জটিলতার কারণে কাজ স্থগিত থাকলেও শিগগিরই তা আবার শুরু হবে।
সমাজের মূলধারার বাইরে থাকা, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার যন্ত্রণায় জীবন পার করা ক্রীড়াবিদদের ঝুলিতে এরই মধ্যে রয়েছে ২১৬টি স্বর্ণ, ১০৯টি রৌপ্য এবং ৮৪টি ব্রোঞ্জ পদক। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা বারবার প্রমাণ করেছেন—সুযোগ পেলে তারাও বিশ্বমঞ্চে দেশের নাম আরো উজ্জ্বল করতে পারেন।
২০১৯ সালের সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিকের আসরে ২২টি স্বর্ণ, নয়টি রৌপ্য ও ছয়টি ব্রোঞ্জসহ মোট ১০৭টি পদক আসে দেশের ঝুলিতে। এছাড়া ২০২৩ সালের বার্লিন স্পেশাল অলিম্পিকে ২৫টি স্বর্ণসহ মোট ৩৪টি পদক অর্জন করে বাংলাদেশের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অ্যাথলিটরা।
২০২৫ সালের ইতালির তুরিনে অনুষ্ঠিত উইন্টার স্পেশাল অলিম্পিকসে নারী ফ্লোরবল বিভাগে ইউক্রেনকে ৪-২ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে বাংলাদেশের নারী দল। গোল করেন স্বর্ণা আক্তার, ফাতেমা আক্তার, ফাবিয়া খাতুন ও তামাল্লিন। তার আগে ২০১৭ সালে অস্ট্রিয়ায় উইন্টার স্পেশাল অলিম্পিকসে ১৫টি স্বর্ণসহ ২৮টি পদক জয় করে বাংলাদেশ।
এ সাফল্যকে আরো এগিয়ে নিতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প’ শীর্ষক এ প্রকল্পের জন্য ঢাকার সাভার উপজেলার বারইগ্রাম ও দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর মৌজায় ১২ দশমিক শূন্য ১ একর খাস জমি ২০১২ সালে প্রতীকী মূল্যে দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত প্রদান করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা। প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তর। নকশায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় পুনর্বাসন কেন্দ্র, ফুটবল ও ক্রিকেট মাঠ, বিনোদন জোন, সুইমিং পুল, মাল্টিপারপাস জিমনেশিয়াম, মসজিদ, আবাসিক কোয়ার্টার, গেস্ট হাউজ ও হোস্টেল। নির্মাণকাজ শুরুর সময়কাল ছিল ২০২১ সালের এপ্রিল এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর। তবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হলেও চার বছরের বেশি সময়ে নির্মাণকাজ এগিয়েছে মাত্র ৫-৬ শতাংশ। বর্তমানে কাজ বন্ধ।
সরজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, বর্তমানে তিনটি ভবনের—আবাসিক ভবন, ডরমিটরি এবং একাডেমিক ভবনের কাজ চলমান। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নির্মাণসামগ্রী। নির্মাণের কাজে নিয়োজিত তিন ঠিকাদারের সাইট অফিসে স্টাফরা এখনো আছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব সাব্বির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাজ বন্ধ হয়নি, খুব শিগগিরই শুরু হবে। ফান্ড পড়ে আছে। নকশাজনিত জটিলতার কারণে সরকারের তরফ থেকে কাজ বন্ধের নির্দেশ আসে। নকশা করেছিল স্থাপত্য অধিদপ্তর। আগের মাস্টারপ্ল্যানটাকে কিছুটা মডিফাই করতে হবে।’
কতটুকু কাজ শেষ হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খুবই অল্প। ৫-৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আমাদের তিনটা ভবনের কাজ চলমান। আবাসিক ভবন, ডরমিটরি বা হোস্টেল ব্লক আর একাডেমিক ভবন। প্রাথমিক অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল। পরে এটাকে বর্ধিত করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে বাজেট বাড়ানো হয়নি। এখন পর্যন্ত ৩১ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর বাইরে আসলে আমি আর কিছু জানি না। প্রশাসনিকভাবে আমাকে যা নির্দেশ দেয়া হয়, আমি সেগুলোই পালন করি।’ এ বিষয়ে আরো জানতে তিনি প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদারের সঙ্গে কথা বলতে অনুরোধ করেন।
স্থাপত্য অধিদপ্তরের সার্কেল-৭, বিভাগ-১৯-এর নির্বাহী স্থপতি শাবাব রায়হান কবির বলেন, ‘ওপর মহলের নির্দেশেই প্রতিবন্ধীদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্সের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।’ ওপর মহলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। বেশকিছু অনিয়মের অভিযোগ ছিল প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। এ কারণেই কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। কবে শুরু হবে সেটা আমি জানি না।’
এ বিষয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্প পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণপূর্তের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী পুনরায় সমীক্ষা যাচাই করে নতুন করে সরকার চিন্তাভাবনা করবে, যাতে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যায়। এটাই শেষ সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে আর বলার কিছু নেই।’ নির্মাণাধীন প্রকল্পে সমীক্ষা যাচাই কীভাবে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটার সমীক্ষা আগে যাচাই হয়নি। বাকিটা জানতে চাইলে অফিসে এসে কথা বলেন।’