দূষণ-বন উজাড়

কুয়াকাটায় ঝুঁকিতে লাল কাঁকড়ার আবাসভূমি

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটকদের জন্য যে কয়েকটি আকর্ষণীয় উপাদান রয়েছে, সেগুলোর একটি লাল কাঁকড়া।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পর্যটকদের জন্য যে কয়েকটি আকর্ষণীয় উপাদান রয়েছে, সেগুলোর একটি লাল কাঁকড়া। লাজুক ও সদা সতর্ক লাল কাঁকড়ার দৌড় পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে উপকূলীয় বন উজাড়, সমুদ্রসৈকত দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছে কাঁকড়ার স্বাভাবিক আবাসভূমি। দিন দিন কমে আসছে এ প্রাণীর সংখ্যাও।

পরিবেশবিদরা বলছেন, কুয়াকাটায় সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের উপভোগ করার পাশাপাশি লাল কাঁকড়ার জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। একসময় সমুদ্রতটের বিস্তীর্ণ বালুচরে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া দেখা যেত। অনেক বিদেশী ভ্রমণকারীর কাছেও এটি ছিল বাড়তি আকর্ষণ। কিন্তু আজ সে দৃশ্য বিরল হয়ে গেছে। সৈকতে গেলে এখন হাতেগোনা কয়েকটি কাঁকড়াই চোখে পড়ে।

এ ব্যাপারে পরিবেশবিদ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, ‘লাল কাঁকড়ার কাজ হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা। ওরা বেলাভূমিতে প্রতিদিন দুবার বালি ও মাটি আলাদা করার কাজ করে। সেটা দেখতে আলপনার মতো মনে হয়। এদের রক্ষা করা সবার কর্তব্য। এদের প্রতিবেশ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে সবার নজর দেয়া প্রয়োজন।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটার গুরুত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে। একটি মহল অবৈধভাবে চর দখল করে বসতবাড়ি, মার্কেট বা হোটেল তৈরি করতে গিয়ে বন উজাড় করছে। চর ও বনের জমিতে পুকুর তৈরি করে চিংড়ির ঘের ও মাছ চাষ করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণেও অনেক বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন বিভাগ থেকে পর্যাপ্ত টহল ও সংরক্ষণ কার্যক্রম চালাতে না পারায় একের পর এক বন উজাড় হচ্ছে। আইন থাকলেও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এসব কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে।

উপকূল পরিবেশ আন্দোলন কুয়াকাটার সভাপতি কেএম বাচ্চু বলেন, ‘২০২১ সালে আমরা প্রথমবার লাল কাঁকড়া ও কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য আলাদা অঞ্চল ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলাম। সাময়িকভাবে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তা টেকসই হয়নি। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।’

পর্যটন সংগঠন টোয়াকের সভাপতি তুশার জানান, কাঁকড়া শুধু কুয়াকাটার সৌন্দর্যই নয়, জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। তাই পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি সংরক্ষণে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটকরা প্লাস্টিক, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রমে চরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। চরে বসতি, দোকানপাট ও রিসোর্ট নির্মাণে বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা জমে যাচ্ছে। এসব বর্জ্য আশপাশের পানিতে গিয়ে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল নষ্ট করছে। মাছের ঘের থেকে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পানিতে মিশে দূষণ সৃষ্টি করছে। ঘেরের বর্জ্য ও গলিত খাদ্যও পানি দূষিত করছে। কাঠ সংগ্রহ ও গাছ কেটে ফেলার কারণে মাটি ক্ষয়ে যাচ্ছে। এতে চরের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির প্রভাবে চরের মাটি ও পানির গুণগত মানও পরিবর্তন হয়ে দূষণের সৃষ্টি হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘লাল কাঁকড়া উপকূলীয় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। এরা সৈকতের মাটি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। আবাসভূমি ধ্বংস হলে এর প্রভাব পুরো ইকোসিস্টেমের ওপর পড়বে।’

সরজমিন দেখা গেছে, বন বিভাগ মহিপুর রেঞ্জের সহযোগিতায় গাছের ডালপালা দিয়ে কোনোভাবে কাঁকড়ার জন্য অস্থায়ী আশ্রয় তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে এ উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় কাঁকড়ার প্রজনন ও আবাস দুটোই হুমকির মুখে পড়েছে।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সজিব বলেন, ‘কুয়াকাটায় আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল সৈকতে ছুটে বেড়ানো আর লাল কাঁকড়া দেখা। কিন্তু এখন সেগুলো চোখে পড়ছে খুব কম, যা হতাশাজনক।’

ট্যুর গাইড হুমায়ুন জানান, অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা, সৈকতে হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ ও বর্জ্য ফেলার কারণে কাঁকড়ার সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে লাল কাঁকড়ার চর। চরে এক সময় বনভূমি ছিল প্রায় ৫০০ একর। দখল ও কাঠ সংগ্রহের কারণে বর্তমানে বনের ৩০-৪০ শতাংশ গাছ টিকে রয়েছে।

এ ব্যাপারে বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা কেএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সীমিত আকারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। তবে দীর্ঘমেয়াদে লাল কাঁকড়া রক্ষায় সরকারি পরিকল্পনা, স্থানীয়দের সহযোগিতা ও পর্যটকদের সচেতনতা জরুরি।’

পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন ধ্বংসের কারণে কাঁকড়ার প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য তাদের স্বাভাবিক জীবনচক্র নষ্ট করছে। যদি এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হয়, তবে অচিরেই বিলীন হয়ে যেতে পারে লাল কাঁকড়ার আবাসভূমি, যা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনবে।

এ বিষয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন উজাড় ও দূষণ লাল কাঁকড়ার প্রজনন ব্যাহত করছে। এখনই কুয়াকাটাকে সুরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা না হলে কয়েক বছরের মধ্যে কাঁকড়ার অস্তিত্বই হারিয়ে যেতে পারে।’

আরও