সড়ক নিরাপত্তা

বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা: অনিয়মের জালে প্রতিদিনের প্রাণহানি

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার পেছনে রয়েছে সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা। নকশা, পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস যাচাই, চালক তৈরির প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও অদক্ষতা প্রকট।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যার পেছনে রয়েছে সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা। নকশা, পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস যাচাই, চালক তৈরির প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও অদক্ষতা প্রকট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পেশাদারত্বের অভাব, অবহেলা ও অজ্ঞতার কারণে প্রতিনিয়ত সড়কে ঝুঁকি বাড়ছে। অথচ এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য, যদি সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

চালকের দক্ষতা যাচাই ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান একটি বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চালকের সড়ক-চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতা, সাইন ও মার্কিং বোঝার ক্ষমতা যাচাই করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সীমিত পরিসরে জিগজ্যাগ প্রশিক্ষণ কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করা হচ্ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যদি বিজ্ঞানভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাহলে চালকের অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বাস, ট্রাকসহ প্রতিটি গাড়ির ফিটনেস যাচাইয়ে ৫০-৬২টি পরীক্ষা প্রয়োজন, যার জন্য গড়ে ৩ ঘণ্টা দরকার। কিন্তু জনবল সংকট ও জবাবদিহির অভাবে অযোগ্য গাড়িকেও ফিটনেস সনদ দেয়া হচ্ছে। ফলে দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের নয়, বরং ফিটনেস ও লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও সমানভাবে দায়ী। ফিটনেস পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই, নেই ডিজিটাল নজরদারি বা সিসিটিভি, ফলে পুরো ব্যবস্থাটি দুর্নীতিগ্রস্ত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটিতে থাকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি, যারা নিজেই সমস্যার উৎস। পুলিশও দায় এড়াতে পারে না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা লাইসেন্সবিহীন চালককে আটক করার দায়িত্ব তাদের, যা তারা পালন করে না। অথচ দুর্ঘটনার পর তারাই বলে, চালকের লাইসেন্স বা গাড়ির ফিটনেস ছিল না। এতে পুলিশও এক ধরনের অংশীদার হয়ে পড়ে, অথচ তদন্ত কমিটিতেও তাদের উপস্থিতি থাকে।

সড়কে শুধু বিশৃঙ্খলা নয়, যারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে, তারাই অনিয়মের জন্ম দিচ্ছে। দ্রুতগতির গাড়ির সঙ্গে ধীরগতির যান, বৈধের সঙ্গে অবৈধ, থেমে থাকা গাড়ির সঙ্গে চলমান গাড়ি—সব মিলিয়ে এক অরাজক পরিবেশ। মহাসড়কে যত্রতত্র গাড়ি থামছে, নির্ধারিত স্থানে বাস থামছে না, নসিমন-করিমনের মতো ধীরগতির যানবাহন মহাসড়কে উঠে পড়ছে, ফলে দ্রুতগতির গাড়ি বাধ্য হচ্ছে লেন পরিবর্তন করতে, ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ পুলিশসহ সবাই বলছে, ‘দ্রুতগতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে’ যা সরলীকরণ বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের অভাবকে তুলে ধরে। বাস্তবে দুর্ঘটনা ঘটে গতি ব্যবধানের কারণে, শুধু উচ্চগতির জন্য নয়।

চালকরা আয়চাপ, চাঁদাবাজি, পুলিশি হয়রানি ও আইনি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না। তারা টানা ৫ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালান বিরামহীনভাবে। ফলে ক্লান্তি ও অসাবধানতা বাড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিণতি। মহাসড়কে চালকদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামের ব্যবস্থা ও সুযোগ নেই। অথচ এ বাস্তবতা কেউ বিবেচনায় নেয় না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করে দায়ী প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় পেশাদারত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। বাংলাদেশে তদন্ত কমিটিতে প্রায়ই সেই ব্যক্তিরাই থাকেন, যারা নিজেই সমস্যার উৎস। তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাবের কারণে দুর্ঘটনার গভীরতর কারণ অনাবিষ্কৃত থেকে যায়। উপসর্গভিত্তিক, চালককেন্দ্রিক দোষারোপই দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বহুস্তরীয় ধাপ—পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা, জনশিক্ষা, সচেতনতা, নিবন্ধন, চালক তৈরির প্রক্রিয়া, ফিটনেস যাচাই ইত্যাদি। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ না করে শুধু ‘‌দ্রুতগতির চালনা’কে দায়ী করা হয়। প্রতিদিন গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে অবৈধ গাড়ি, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের। বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। পরিবহন ব্যবস্থাপনা দিন দিন বিশৃঙ্খল হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও জবাবদিহির অভাবই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

বিশ্বজুড়ে সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব দেয়া হয়। তারা বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে কাজ করেন, লক্ষ্যভিত্তিক দুর্ঘটনা হ্রাস কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। আমাদের দেশে সড়ক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকেই পেশাগতভাবে অপ্রস্তুত, অদক্ষ ও সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে কাজ করেন। ফলে ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা বাড়ে।

দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতি শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিকও। এ ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। ভারতে যেমন একজন মানুষের সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবদান হিসাব করে মৃত্যুর মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তেমনি আমাদেরও প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব এবং ক্ষয়ক্ষতির যৌক্তিক ইউনিট রেটের অনুপস্থিতি। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে এই রেট দুই থেকে আড়াই গুণ কম। ফলে সামগ্রিক ক্ষতির সঠিক হিসাব করা সম্ভব হয় না।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ে জনমনে প্রত্যাশা জেগেছিল। অভ্যুত্থানে ছাত্র নেতৃত্বের একটা বড় অংশ ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অভ্যুত্থান-পরবর্তী কয়েক দিন সড়ক ব্যবস্থাপনায় অংশ নিয়েছিল ছাত্র-তরুণরা। কিন্তু সরকার গঠনের পর তারুণ্যের এ শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। নিরাপদ সড়ক নিয়ে ছাত্র-জনতার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তা যে তিমিরে সে তিমিরেই রয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের। অথচ দেশের বিভিন্ন সংস্থা বলছে, এ সংখ্যা ছয়-সাত হাজার। আহতদের ক্ষতি আরো গভীর—পঙ্গুত্বের ফলে কর্মক্ষমতা হারিয়ে তারা পরিবার ও সমাজে বোঝা হয়ে থাকছেন। কিন্তু পুলিশ বা সংবাদভিত্তিক পরিসংখ্যানে এ বাস্তবতা প্রতিফলিত হয় না।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে জবাবদিহিমূলক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে হবে, কাঠামোগত ত্রুটি চিহ্নিত করতে হবে এবং সফল দেশগুলোর মতো লক্ষ্যভিত্তিক দুর্ঘটনা হ্রাস কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। তা না হলে সড়কে প্রাণহানি শুধু বাড়বে, কমবে না।

ড. সামছুল হক: অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

আরও