জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ—একসঙ্গে তিনটি সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। এ সংকট শুধু আর্থিক নয়, বরং বাজেট ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ওপর চাপ ফেলার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক নীতিকেও প্রভাবিত করছে।’
গতকাল সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত ‘বাজেট ঘিরে নাগরিক ভাবনা ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘তরল জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যদি আনতে না পারি, অন্য কোনোখান দিয়ে আমার এটা আনার প্রয়োজন দেখা দেবে। অর্থাৎ এখানে ব্যয় বাড়বে। আর্থিক চাপের পাশাপাশি বাজেটের চাপের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের চাপও কিন্তু একই রকমভাবে বাড়বে—এটা আমরা পরিষ্কার দেখছি।’
বৈদেশিক নীতির সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, সেই চুক্তির অধীনে চীন ও রাশিয়া থেকে আমাদের অন্যান্য সরবরাহ আনার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আসে কিনা—এটা এখন সরকারের বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ অর্থনীতির সঙ্গে এখন বৈদেশিক নীতি যুক্ত হয়ে গেছে। এটি হলো বর্তমানে জিও-স্ট্র্যাটেজিক কম্পালশন।’
বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে যেভাবে জ্বালানির দাম বাড়ছে, তাতে সরকারের ব্যয় বাড়বে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ। যার প্রভাবে চলতি হিসাবে ঘাটতি আরো বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি আইএমএফের শর্তে পরিপন্থী, যা ২০২৮ সালের মধ্যে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে সরকারকে।’
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘প্রথমে সরকার সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং সরবরাহভিত্তিক যদি কোনো অসংগতি থাকে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করবে। এরপর ট্যাক্স ও এক্সাইজ কমাবে, যাতে করে দামটা বাড়াতে না হয়। তারপর একসময় সে অবশ্যই বাধ্য হবে তেলের দাম বাড়াতে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে জ্বালানির দাম সহজ রাখার জন্য এক্সাইজ ও ট্যাক্স কমিয়ে দিলে স্বাভাবিকভাবে অন্য ক্ষেত্রে ব্যয় করার ক্ষমতা কমে যাবে। এটাকে আমরা ইকোনমিকসে ট্রেড অব বলি। সরকার কোথায় কোথায় ছাড় দেবে তার উন্নয়ন কার্যক্রমে—সেটা বোঝার সময় এখন এসেছে। এ মুহূর্তে জ্বালানি খাত পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে বোঝার সবচেয়ে বড় জায়গা। এর মধ্য দিয়ে শুধু আর্থিক ব্যবস্থাপনা নয়, ভূরাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাও উন্মোচিত হবে।’
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন সরকারকে বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। পরাবাস্তব বাজেট করলে হবে না। সরকারকে প্রথম বছরেই কঠোর বাজেট করতে হবে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নির্দয় হতেই হবে। অযৌক্তিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়ানোয় জোর দিতে হবে।’
বর্তমান সংকট মোকাবেলায় সরকারের স্বল্পমেয়াদি রূপরেখা ঘোষণার ওপর জোর দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যার কারণে খুব দ্রুত সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে তিন-চার মাসের জন্য একটি রূপরেখা দেয়া দরকার। এটিকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে তিন বছরের জন্য মধ্যমেয়াদি বাজেট–কাঠামো করা যেতে পারে। এ নিয়ে এখনই একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের উপযুক্ত সময়।’
এপ্রিলে জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রীকে অর্থনৈতিক বিষয়ে বিবৃতি প্রদানের পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘সেই বিবৃতিতে ওনারা (বর্তমান সরকার) অর্থনীতি কী অবস্থায় পেল এবং কী ধরনের চাপের মুখে আছে সেসব থাকবে।’
ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী নাজিবা মোহাম্মদ আলতাফ প্রমুখ।