ঢাকা শহরের সরকারি জমিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে আবাসন প্রকল্প করা হলে সরকার কোনো অর্থ বিনিয়োগ ছাড়াই বিপুল পরিমাণ আবাসন পেতে পারে বলে জানিয়েছেন ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসিমুল বাতেন। তিনি বলেন, সরকারি খাতের যে জমি আছে সেগুলো যদি ডেভেলপাররা পায় বিনিময়ে সরকার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফ্ল্যাটের মালিক হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬’-এর ‘স্মার্ট-সবুজ আবাসন ও অর্থায়ন’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। স্মার্ট আবাসন, টেকসই নগরায়ণ ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে নীতিগত চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয় নিয়ে আয়োজিত কনক্লেভে ‘জ্বালানি রূপান্তর: এলপিজি ও সৌরশক্তি’ শীর্ষক আলোচনাতেও নাসিমুল বাতেন অংশ নেন।
ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার আবাসনকে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে আনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশীদারত্বের সুযোগ রয়েছে। ঢাকার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বড় শহরেও এ সুযোগ কাজে লাগানো যায়। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার হাতে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। এসব জমি চিহ্নিত করে যৌথ উদ্যোগে আবাসন করা সম্ভব। গৃহায়ণ খাতের বেসরকারি ডেভেলপারদের মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশই জমি কিনতে ব্যয় হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, সরকারি জমি পাওয়া গেলে ডেভেলপাররা আবাসন নির্মাণ করবে এবং বিনিময়ে সরকার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফ্ল্যাটের মালিক হবে। এই ফ্ল্যাটগুলো সরকার তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া এগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে ভাড়া দেয়া বা বিক্রি করার সুযোগও থাকবে। এর ফলে কোনো অর্থ খরচ না করেই সরকারের জন্য বিপুল পরিমাণ আবাসনের সংস্থান হবে।
ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বর্তমানে রাজউক এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পে তারা নিজস্ব মূলধন ও সময় বিনিয়োগ করছে। তবে এর আগে রাজউকের উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ফ্ল্যাট বিক্রি করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। খরচ ও ঋণের বিষয়ে নাসিমুল বাতেন বলেন, জমি পাওয়ার মাধ্যমে নির্মাণ খরচ বিবেচনায় নিয়ে ডেভেলপাররা প্রতি বর্গফুট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারবে। এতে ৬০০ থেকে ১ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মোট দাম পড়বে ২৪ লাখ থেকে ৩৫-৪০ লাখ টাকা। এসব ফ্ল্যাট কেনার জন্য ক্রেতাদের যদি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেয়া যায়, তবে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একজন সাধারণ মানুষ তার নিজস্ব আবাসনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন।
স্মার্ট শহরের বিষয়ে তিনি জানান, একটি আধুনিক শহরের কথা ভাবলে উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা মাথায় আসে। দীর্ঘদিনের যানজট ও ভোগান্তি শেষে ঢাকা একটি উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেল পেয়েছে। এসবের মাধ্যমে নগরী ধীরে ধীরে একটি উন্নত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক প্রতিবেদনে ১৭৩টি রাজধানী শহরের মধ্যে বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম হয়েছে। ঢাকার নিচে শুধু সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি রয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি মানসম্মত নগর গঠনে আরো অনেক পথ বাকি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই কেবল একটি শহর আধুনিক বা স্মার্ট হয় না। এর জন্য শহরের অধিবাসীদের খরচ সাশ্রয়, দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নগর প্রসারের কারণে গত ১০ থেকে ২০ বছরে ঢাকায় জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকায় মানুষের ঢাকায় আসা থামানো যাচ্ছে না। অথচ এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাড়ায় থাকেন এবং অনেকে বস্তিতে বাস করছেন। ফলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের মান ধরে রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাছাড়া আধুনিক প্রকল্পের সুবিধা শহরের সব অঞ্চলের মানুষ সমানভাবে পাচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মেট্রোরেল হওয়ার পর কেবল নির্দিষ্ট রুটের মানুষই এর সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু সার্বিক যানজট কমেনি। এ সংকট মোকাবেলায় সরকারি সংস্থা, বেসরকারি খাত ও নগর পরিকল্পনাবিদদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।