চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নাসিমা বেগম ফ্রিজিয়ান জাতের (সংকর) দুটি গাভী পালন করেন। এর একটি প্রথমবার বাচ্চা দেয়ার পর দ্বিতীয়বার সময় নেয় প্রায় ১৩ মাস। তৃতীয় বাছুরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে সাড়ে ১৪ মাসেরও বেশি। নাসিমার দাবি, পর্যাপ্ত খাবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও গরুর ঘর ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও গাভীর প্রজননক্ষমতা ফিরে আসতে সময় বেশি লাগছে।
নাসিমার মতো অনেক খামারির অভিযোগ, দেশে দুধ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ফ্রিজিয়ান সংকর জাতের গাভীর বাছুর দেয়ার মধ্যবর্তী সময় ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। এ প্রবণতার প্রমাণ মিলেছে গবেষণায়ও। বিশেষ করে গাভীর শরীরে ফ্রিজিয়ান জাতের জিনগত অবদানের মাত্রা ৭৫ শতাংশ ছাড়ালে গর্ভধারণে বেশি সময় লাগছে। এতে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও প্রজনন ব্যয় ও পরিচর্যার খরচ বেড়ে লাভ কমছে খামারির।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনায় একটি গাভীর ১২-১৩ মাসের মধ্যে একবার বাচ্চা দেয়ার লক্ষ্য থাকে। কিন্তু কালভিং ইন্টারভাল বা দুই বাচ্চা প্রসবের মধ্যবর্তী সময় দীর্ঘ হলে গাভীর জীবদ্দশায় বাচ্চা দেয়ার সংখ্যা কমে যায়। একই সঙ্গে দুধ উৎপাদনের চক্র ব্যাহত হয় এবং দুধ না পাওয়া সময়ে ব্যয় বাড়ে। অন্যদিকে গাভী দুধ না দিলেও তার পুষ্টিকর খাবার ও পরিচর্যা চালিয়ে যেতে হয়।
রাজশাহীর চৌধুরীর এগ্রোর স্বত্বাধিকারী আজমান চৌধুরী জানান, কয়েকবার প্রজনন করানোর পরও যেসব গাভী গর্ভবতী হয় না, সেগুলো বিক্রি করে নতুন গাভী কেনেন তিনি। বণিক বার্তাকে খামারি বলেন, ‘কিছু গাভীর কয়েকবার হিট আসে। দুই-তিনবার প্রজনন করানোর পরও গর্ভবতী না হলে সেগুলো বিক্রি করে দিই। যেসব গাভীর গর্ভধারণে সময় বেশি লাগে, সেগুলোর বাছুর পেতেও দেরি হয়। এ সময়ে খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় বাড়ে, কিন্তু আয় আসে না।’
গাভী সহজে গর্ভধারণ করতে না পারলে বারবার কৃত্রিম প্রজনন (এআই) করাতে হয়। এতে প্রজনন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খামারির সময় ও শ্রম নষ্ট হয়। দীর্ঘ সময় দুধ উৎপাদন না করা গাভীর শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকিও থাকে। ‘বাংলাদেশে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান সংকর দুগ্ধবতী গাভীর উৎপাদন ও প্রজনন সক্ষমতার ওপর অঞ্চল, হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাতের জিনগত অবদানের মাত্রা, বাচ্চা প্রসবের ক্রম, শারীরিক অবস্থা স্কোর এবং প্রথমবার প্রজনন করানোর বয়সের প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা সাময়িকী রিসার্চগেটে গত এপ্রিলে এটি প্রকাশ হয়। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রামে পরিচালিত গবেষণাটিতে দেখা যায়, গাভীর শরীরে ফ্রিজিয়ান জাতের জিনগত অবদানের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে প্রতি গর্ভধারণে প্রজনন করানোর সংখ্যাও বেড়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গাভীর শরীরে ফ্রিজিয়ান জিনগত অবদান ৬২ দশমিক ৫ থেকে ৭৫ শতাংশের কম হলে প্রতি গর্ভধারণে গড়ে ১ দশমিক ৪১ বার প্রজনন করাতে হয়েছে। অন্যদিকে এ অবদান ৭৫ শতাংশের বেশি হলে প্রজনন করাতে হয়েছে গড়ে ২ দশমিক ১৪ বার। একই সঙ্গে উচ্চমাত্রার ফ্রিজিয়ান জিনগত অবদানসম্পন্ন গাভীর বাচ্চা প্রসবের মধ্যবর্তী সময় ছিল সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৯৭ মাস।
তবে উচ্চমাত্রার সংকর গাভীতে দুধ উৎপাদন তুলনামূলক বেশি। গবেষণায় ৭৫ শতাংশের বেশি ফ্রিজিয়ান জিনগত অবদানসম্পন্ন গাভীর গড় দৈনিক দুধ উৎপাদন পাওয়া গেছে ১৭ দশমিক ৬১ লিটার। ৭৫ শতাংশ অবদানসম্পন্ন গাভীর ক্ষেত্রে তা ১৪ দশমিক ৪৫ লিটার ও ৬২ দশমিক ৫ থেকে ৭৫ শতাংশের কম অবদানসম্পন্ন গাভীর ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫২ লিটার। অর্থাৎ ফ্রিজিয়ান জিনগত অবদান বাড়লে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও প্রজনন দক্ষতার ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় প্রথম ও দ্বিতীয়বার বাচ্চা দেয়া গাভীর ক্ষেত্রে দুই প্রসবের মধ্যবর্তী সময় ছিল ১৩ দশমিক ৮৭ মাস। পঞ্চমবার বাচ্চা দেয়া গাভীর ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৫৭ মাসে।
গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় উচ্চমাত্রার ফ্রিজিয়ান সংকর গাভীকে মানিয়ে নিতে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। তাপমাত্রাজনিত চাপ বা হিট স্ট্রেস প্রজনন চক্রে ব্যাঘাত ঘটিয়ে গর্ভধারণ বিলম্বিত করতে পারে। এর সঙ্গে সুষম খাদ্যের ঘাটতি, ভিটামিন ও খনিজের অভাব, প্রসব-পরবর্তী শারীরিক দুর্বলতা এবং সঠিক সময়ে হিট শনাক্ত করতে না পারার মতো বিষয়ও যুক্ত। ফলে শুধু জাতের জিনগত বৈশিষ্ট্য নয়, গাভীর পরিচর্যা ও খামার ব্যবস্থাপনাও প্রজননক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর মো. ইকবাল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্রিজিয়ান জাতের উচ্চ দুধ উৎপাদনকারী গাভীগুলো মূলত শীতপ্রধান দেশের উপযোগী। বাংলাদেশে পালনের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার পার্থক্য তাদের উৎপাদন ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ছোট খামারিদের অনেকেই এ জাতের গাভীর খাদ্য, পুষ্টি ও পরিচর্যা সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না। ফলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে, যা দুধ উৎপাদন ও প্রজনন দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় গাভীর হিট শনাক্ত করতে না পারা, সঠিক সময়ে বীজ (সিমেন) প্রয়োগ না করা কিংবা কৃত্রিম প্রজননকারীর ত্রুটির কারণেও গর্ভধারণে দেরি হয়। এসব কারণে কালভিং ইন্টারভাল বাড়তে পারে।’
বাংলাদেশের দুগ্ধবতী গাভীর প্রজনন সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায়ও একই ধরনের সমস্যা উঠে এসেছে। ‘ক্ষুদ্র খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান সংকর ও দেশী গাভীর উৎপাদন ও প্রজনন সক্ষমতা’ শীর্ষক এক গবেষণায় ফ্রিজিয়ান সংকর গাভীর প্রথম বাছুর দেয়ার গড় বয়স পাওয়া যায় ৩৬ দশমিক ৪৩ মাস। প্রসব-পরবর্তী প্রথম হিট আসতে গড়ে ১২৫ দিন এবং দুই বাচ্চা প্রসবের মধ্যবর্তী সময় ৪২০ দিন বা ১৪ মাস লেগেছে।
গত বছর প্রকাশিত বগুড়াভিত্তিক আরেক গবেষণায় হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহীওয়াল ও দেশী জাতের গাভীর উৎপাদন ও প্রজনন বৈশিষ্ট্য তুলনা করা হয়। এতে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান সংকর গাভীর প্রথম গর্ভধারণের উপযোগী বয়স ২৫ দশমিক ৮৬ মাস পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় এ বয়স ছিল ২৪ দশমিক ৬৪ মাস। একই গবেষণায় শাহীওয়াল সংকর গাভীর ক্ষেত্রে প্রথম গর্ভধারণের উপযোগী বয়স ২৫ দশমিক ৬৬ মাস বেড়ে ৩১ মাস হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নর্থবেঙ্গল ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন মনে করেন, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাই অনেক ক্ষেত্রে কালভিং ইন্টারভাল দীর্ঘ হওয়ার প্রধান কারণ। আগে তার খামারেও দুই বাচ্চার মধ্যবর্তী সময় বেশি ছিল। পরে গাভীর পুষ্টি, হিট শনাক্তকরণ ও পরিচর্যা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বাড়ানোর পর এখন ১২-১৩ মাসের মধ্যে বাছুর পাওয়া যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অনেক খামারি দুধ উৎপাদনের দিকে বেশি মনোযোগ দিলেও গাভীর প্রজননস্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেন না। আবার বেশি দুধ পাওয়ার আশায় কেউ কেউ শতভাগ বা ৯৫ শতাংশ ফ্রিজিয়ান জাতের বীজ চান। কিন্তু বাংলাদেশের পরিবেশে এমন উচ্চ মাত্রার সংকরায়ন সব ক্ষেত্রে উপযোগী নয়।’ তার মতে, ৬০-৭০ শতাংশ ফ্রিজিয়ান জিনগত অবদানসম্পন্ন গাভী পালন তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দুই বাছুর প্রসবের মধ্যবর্তী সময় বাড়ার পেছনে ক্ষুদ্র খামারিদের দক্ষতার ঘাটতি ও বিদেশী জাতের গাভীর যথাযথ পরিচর্যার অভাব ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যাপ্ত খাবার, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে ব্যাহত হতে পারে গাভীর প্রজননক্ষমতা ও দুধ উৎপাদন। এ সমস্যা কমাতে উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্রিজিয়ান ও শাহীওয়াল জাতের গাভীর উৎপাদন ও প্রজনন সক্ষমতার সঙ্গে খাদ্য, পুষ্টি, পরিচর্যা ও প্রয়োজনে ওষুধ প্রয়োগের সম্পর্ক রয়েছে। এসব বিষয়ে ঘাটতি থাকলে গর্ভধারণে দেরি হতে পারে, কমতে পারে দুধ উৎপাদনও। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় খামারি ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নত খামার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে বিভিন্ন মাত্রার ফ্রিজিয়ান সংকর জাতের অভিযোজনক্ষমতা, প্রজনন দক্ষতা ও দুধ উৎপাদনের সম্পর্ক নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে উপযোগী সংকরায়নের মাত্রা নির্ধারণ এবং খামারিদের কাছে কার্যকর প্রযুক্তি ও পরামর্শ পৌঁছে দিতে পারলে উৎপাদন ব্যয় কমানো ও খামারের মুনাফা বাড়ানো সম্ভব বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক যারা আছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। যদি গ্যাপ (প্রজনন সময়) বাড়ে, সেজন্য গবেষণা বাড়ানোর প্রয়োজন মনে হয়, সরকার গবেষণা বাড়াবে। গবেষণায় সরকার কোটি টাকা ব্যয় করছে। নানা প্রকল্পও করছে। গবেষণাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।’
এদিকে মন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রাণী উৎপাদন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বিপ্লব কুমার রায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ডেইরি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও দপ্তরপ্রধান ড. মো. রাকিবুল হাসানের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।