তুরস্কের আনতালিয়ায় ৯-২০ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১ সামনে রেখে সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ বিশ্বনেতা ও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, জলবায়ু সংকট শিশুরা তৈরি করেনি, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। তাই জলবায়ু আলোচনার সুনির্দিষ্ট ফলাফলের মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মতামতকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এসব উদ্যোগে শিশুদের কাছে পৌঁছায়—এমন অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
গত ৯-১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ন্যাশনাল চিলড্রেন’স টাস্কফোর্সের (এনসিটিএফ) ১৭২ শিশু গবেষক ৩৮টি জেলার জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ১০-১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ৩৭৫ শিশুর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় গ্রাম, নদীবেষ্টিত চর, হাওর, পার্বত্যাঞ্চল, চা-বাগান ও শহরের বস্তি।
জরিপে অংশ নেয়া এলাকাগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন এরই মধ্যে শিশুদের শৈশবের বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। প্রায় সব শিশু (৯৬ শতাংশ) গত দুই বছরে অন্তত একটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে তীব্র তাপপ্রবাহ (৫৫ শতাংশ), এরপর রয়েছে বন্যা (৪২ শতাংশ)।
গত এক বছরে দুর্যোগ বা আবহাওয়াজনিত কারণে বিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৪৯ শতাংশ শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল। অনুপস্থিতির হিসাব দেয়া ৬১৭ শিশু মোট ৭ হাজার ৫৬৭ শিক্ষা দিবস হারিয়েছে। মাত্র ৩৫ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, তাদের বিদ্যালয়ে দুর্যোগের সময় কী করতে হবে, তা শেখানো হয়।
দুর্যোগ বা তাপপ্রবাহের পর ৮০ শতাংশ শিশু অসুস্থ হয়েছে এবং ৫৩ শতাংশ শিশু নিরাপদ পানীয় জল পেতে সমস্যার মুখে পড়ছে।
জরিপে অংশ নেয়া ৩৭ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে; উপকূলীয় এলাকায় এ হার ৭২ শতাংশ। দুর্যোগ আশ্রয় কেন্দ্র ব্যবহার করা ৫৬১ শিশুর মধ্যে ৬৩ শতাংশ জানিয়েছে, সেখানে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার বা নিরাপদ স্থান ছিল না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ভাবলে ৬৪ শতাংশ শিশু ভয় পায়, আর মাত্র ৪ শতাংশ আশাবাদী বোধ করে। বিদ্যালয় বা স্থানীয় সরকার কখনো দুর্যোগ পরিকল্পনা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চায়নি এমন শিশুর হার ৮১ শতাংশ। অথচ ৮১ শতাংশ শিশু নিজেরাই জলবায়ু কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থায়ন চায়।
নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ৮৩ শতাংশ শিশু জানিয়েছে, দুর্যোগের পর তাদের পরিবারের আয় কমে গেছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অন্য শিশুদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি (৫৪ শতাংশ; সব শিশুর ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ)।
শিশুরা এ সংকট তৈরি করেনি, কিন্তু কী করলে তাদের উপকার হবে, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট—নিরাপদ বিদ্যালয়, বিশুদ্ধ পানি, তাদের বোধগম্য আগাম সতর্কবার্তা, অসুস্থ হলে চিকিৎসা এবং তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে মতামত দেয়ার সুযোগ।
সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, ‘বাংলাদেশের শিশুরা এ সংকট সৃষ্টির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। জরিপে তাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলো উঠে এসেছে, এসব চাহিদা ও সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের। আমরা দেখেছি, গত দুই বছরে ৯৬ শতাংশ শিশু অন্তত একটি দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। শুধু এ পরিসংখ্যানই পদক্ষেপ নেয়ার জরুরি আহ্বান জানায়। কপ৩১ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে জাতীয় প্রেক্ষাপটগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো কীভাবে বৈশ্বিক অঙ্গীকারের অংশ হতে পারে, তা দেখতে হবে, যাতে জলবায়ু ও অর্থায়নবিষয়ক সিদ্ধান্ত কার্যকরভাবে শিশুদের কাছে পৌঁছায়।’