নিম্নমানের বাসস্থান, নেই স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত শ্রমিকরা

দেশের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের মূল কারিগর নির্মাণ শ্রমিকরা।

দেশের সব ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের মূল কারিগর নির্মাণ শ্রমিকরা। উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দরপত্রে নির্মাণ শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য রাখা হয় আলাদা বরাদ্দ। এ-সংক্রান্ত আইনও রয়েছে। যেখানে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বাসস্থান, সুস্থ কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, মজুরিসহ মানবাধিকারের মানদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে এসব মানদণ্ড না মেনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নির্মাণ শ্রমিকদের রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শ্রমিকদের শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, ত্বকের সমস্যা ও সংক্রামক রোগসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, গণপূর্ত বিভাগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ কৃষি, ক্রীড়াসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

বান্দরবান এলজিইডির তত্ত্বাবধানে চলমান কয়েকটি কাজের একটি রেইচা-গোয়ালিয়াখোলা সড়ক নির্মাণ। প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়ক তিনটি প্যাকেজে ভাগ করে বর্ধিতকরণ করা হচ্ছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, রেইচা থলিপাড়া এলাকায় রয়েছে একটি লেবারশেড (শ্রমিকদের থাকার বাসস্থান)। রঙ ছাড়া পুরনো-নতুন মিলে টিনের বেড়া ও চালের এ ঘরের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৮০ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। ঘরটির ভেতরে শ্রমিকদের থাকার জন্য চৌকি করে দেয়া হলেও মাটির মেঝে স্যাঁতসেঁতে, নোংরা ও দুর্গন্ধ। ভেতরে ও বাইরে রাখা হয়েছে নির্মাণসামগ্রীগুলো। একটু অসতর্ক হলেই ছোট-বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া শৌচাগারও অস্বাস্থ্যকর, যা জনস্বাস্থ্যে বিভিন্ন রোগের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সংক্রমণের জন্য হুমকি।

রাকীব নামে এক শ্রমিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহরের বাইরে বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রকল্পে কাজ করেছি। কোনো কোনো জায়গার লেবারশেডে রাতে ঘুমানোর সময় ইটের ওপর বস্তা বা কাপড় রেখে বালিশ বানিয়ে ঘুমাতে হয়েছে।’ আবার কোনো কোনো স্থানে সিমেন্টের বস্তার ভেতরে বালি ঢুকিয়ে বালিশ বানিয়ে ঘুমানোর অভিজ্ঞতার কথাও বলেন তিনি।

রেইচা-গোয়ালিয়া সড়কের তিনটি প্যাকেজে চলমান কাজের বিষয় নিশ্চিত করেছেন এলজিইডির বান্দরবান সদর উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আমানুর রহমান আমান। প্রতিটি প্যাকেজে শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কোনো ঠিকাদার যদি মানসম্মত লেবারশেড না করে, তবে সে টাকা ফেরত যাবে বলে তিনি দাবি করেন।

রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা পরিষদ ভবন ও বাঙ্গালহালিয়া ইউনিয়নের ডংনালা সড়ক থেকে জ্যোতিশ্বর বেদান্ত মঠ ও মিশনের আরসিসি রাস্তা নির্মাণকাজ করা শ্রমিকদের জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছে নিম্নমানের বাসস্থান। সড়কটি বাস্তবায়ন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। ১০-১২ লাখ টাকার এ সড়কের দরপত্র প্রাক্কলনে শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন উন্নয়ন বোর্ড রাঙ্গামাটির সহকারী প্রকৌশলী ত্রয়া সরকার।

অন্যদিকে খাগড়াছড়ি সদর থেকে দীঘিনালা পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সড়কটিতে কর্মরত শ্রমিকদের বাসস্থানও মানসম্মত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

শ্রম আইন অনুযায়ী নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থানের ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করা যায়নি বলে স্বীকার করেছেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাসস্থানের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনও নিশ্চিত করা জরুরি। কিছু ঠিকাদার আছেন যারা এসব বিষয়ে উদাসীন। এসব বিষয়ে নজর দেয়া হবে।’

খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়ক প্রশস্তকরণকাজেও শ্রমিকদের বাসস্থানের জন্য বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগ খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাকসুদুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে কাজটির প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে বিদেশী দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়নে বাস্তবায়িত উন্নয়ন কার্যক্রমে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হাইজেনিক বাসস্থানসহ স্যানিটেশনের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকে।’

শ্রমিকদের বাসস্থানসহ স্যানিটেশনের জন্য বরাদ্দ না থাকলেও সব ধরনের টেন্ডারে শ্রম আইনের শর্তাবলি পালন করার বিধান রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকৌশলীরা। তারা বলছেন, বরাদ্দ না থাকার কারণে বিষয়টি মানবিক হলেও শ্রমিকদের বাসস্থানসহ স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয় ঠিকাদারদের ওপর ছেড়ে দিয়ে দায় সারছে সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো। প্রকৃত বাস্তবতা হলো রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের কারিগররা কর্মস্থলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকছেন।

অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন কার্যকর করতে সার্বক্ষণিক কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী শরীফ আহাম্মেদ আজাদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকট ও দাপ্তরিক পরিবহন না থাকায় তিন পার্বত্য জেলার শ্রমিকদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসম্মত বিষয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বাস্তবতার মধ্যেও নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিন জেলার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়মিতভাবে নজরদারি আরো বাড়ানো হবে। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে আইনি বিষয়গুলো যাচাই করা হবে। ত্রুটি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার স্বার্থে টেন্ডারে শ্রম আইনের শর্তবলি পালন করার বিধান রাখা হয়েছে। এর পরও বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’

আরও