সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়

প্রধান শিক্ষকের ৬৬% ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৭৫% পদ ফাঁকা

মাউশির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদের বড় অংশ শূন্য। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে, এসএসসির ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে

দেশে শতবর্ষ পুরনো স্কুলের একটি রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। শিক্ষার মানের উৎকর্ষে জেলাজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন চলছে কোনো নেতৃত্ব ছাড়া। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও দুই সহকারী প্রধান শিক্ষকের তিনটি পদই শূন্য। সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ১৪টি। এ চিত্র শুধু রাজবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের নয়। দেশের অনেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমন শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানে এবং এসএসসির ফলাফলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

রাজবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালাউদ্দিন বলেন, ‘পদ শূন্য থাকায় এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এভাবে প্রক্সি ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকরা নিজেদের বিষয়ের যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার সময় পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষার মান খারাপ হচ্ছে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষকের পদের বড় অংশ শূন্য। আর মাঠপর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা মনিটরিংয়ে যেসব পদের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন সেখানেও শূন্য রয়েছে অনেক পদ।

দেশে বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২। এর মধ্যে যেসব বিদ্যালয় নতুন জাতীয়করণ হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশে প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদই সৃজন হয়নি। এর জেরে বিদ্যালয় সংখ্যা ৭০২ হলেও প্রধান শিক্ষকের পদ আছে ৫৭২টি। এই ৫৭২ পদের ৩৭৯টি শূন্য, যা মোট পদের ৬৬ শতাংশ। একই চিত্র সহকারী প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক সহকারী শিক্ষক পদের ক্ষেত্রেও। বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণত এক বা একাধিক সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ থাকে। বর্তমানে ৭০৩ সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত ১৭৫ জন আর শূন্য পদের সংখ্যা ৫২৮, যা মোট পদের ৭৫ শতাংশ। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক ১৬ হাজার ১৪১ পদের বিপরীতে কর্মরত ১০ হাজার ৯৩ জন, শূন্য পদের সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮, যা মোট পদের প্রায় ৩৭ শতাংশ।

শিক্ষকরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান বা সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে যারা আছেন তারা বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে তারা শ্রেণীকক্ষে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পাঠদানে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক তৎপর, সেখানে শিক্ষার মান, পঠন-পাঠন এবং শিক্ষার্থীদের মনন বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তাই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ ফাঁকা থাকা শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক বিদ্যালয়ে ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়েরও শিক্ষক নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস নেয়া হচ্ছে।’

রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, এসএসসিতে খারাপ ফলের বড় কারণ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব। পর্যাপ্ত শিক্ষক, অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগ থাকায় ক্যাডেট কলেজগুলো ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করছে।

শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন শিক্ষক একটি বিষয়ে দক্ষ হলেও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে তাকে অন্য বিষয়ের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। এতে ক্লাস চালু রাখা সম্ভব হলেও শিক্ষার্থীরা কতটা কাঙ্ক্ষিত মানের শিক্ষা পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকছে।

চলতি বছর মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সের তথ্যে উঠে এসেছিল যে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে যা শিখছে তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতার সমান।

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতির প্রতিফলন দেখা গেছে চলতি বছরের এসএসসির ফলাফলেও। ২০২৬ সালে এসএসসিতে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে গণিত ও ইংরেজিতে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত ২০২৪-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এ দুই বিষয়ের শিক্ষকদের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর নেই।

শিক্ষকের মতো সংকট রয়েছে মনিটরিং পদগুলোয়ও। বর্তমান কাঠামোয় আঞ্চলিক বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারাই মূলত মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তবে এ পদগুলোরও বেশির ভাগই শূন্য।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তাদের মতে, শিক্ষা খাতে গত দুই দশকে নানা উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয় করা হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কোনোটিই আশানুরূপ ফলপ্রসূ হয়নি।

শিক্ষক সংকট নিয়ে মাউশি, খুলনা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর ড. মো. আনিস-আর-রেজা বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদানে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে খুব দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যেহেতু শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি মন্ত্রণালয় দেখে, তাই তারা দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করছি।’

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় পরিদর্শক ও সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি করে পদের সবক’টিই (১০০ শতাংশ) বর্তমানে শূন্য। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদের মধ্যে ২৩টি শূন্য (৩৬ শতাংশ) এবং সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদের সবই (১০০ শতাংশ) ফাঁকা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৪৯৬টি পদের মধ্যে ৩১৫টি (৬৪ শতাংশ) ও সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ৪৯৬টির মধ্যে ৩০৭টি (৬২ শতাংশ) শূন্য রয়েছে।

সিলেট জেলার শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. আব্দুল ওয়াদুদ। সিলেটের আঞ্চলিক উপপরিচালক পদ শূন্য থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সেটিও পালন করছেন আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষকের বড় ধরনের সংকট রয়েছে। শিক্ষা অফিসগুলোয় পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নেই। এসব কারণে চাইলেও আমরা বড় পরিসরে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পারছি না। তবে সীমিত সামর্থ্যেও আমরা চেষ্টা করছি।’

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ফল বিপর্যয় হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে। এ বছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। শিক্ষক সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. শহীদুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে।’

শিক্ষক ও কর্মকর্তা সংকটের কারণে শিক্ষার মান ব্যাহত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে শিক্ষার মান ব্যাহত হয়। এর মধ্যে শিক্ষক ও কর্মকর্তা সংকটও একটি কারণ হতে পারে।’

শিক্ষাবিদদের মতে, মানসম্মত শিক্ষার জন্য দক্ষ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের পাশাপাশি মনিটরিংও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা পদগুলো ফাঁকা থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে তদারক করা হচ্ছে না। এসব সমস্যার সমাধান না হলে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

মাউশির মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘জনবল কাঠামো অনুযায়ী বিভিন্ন পদে পর্যাপ্ত লোকবল নেই। পদ শূন্য হওয়া এবং তা পূরণ একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার মাউশির নেই। মাউশি শূন্য পদের চাহিদা পেলে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে। এরপর মন্ত্রণালয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় এবং পিএসসির মাধ্যমে নন-ক্যাডার থেকে প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ঢাকা শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের কাজ চলছে।’

শিক্ষক পদে ঘাটতি থাকলেও পাঠদান বা ক্লাস বন্ধ থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি বিদ্যালয়ে যেখানে ২০ জন শিক্ষকের প্রয়োজন, সেখানে হয়তো ১৫ জন কর্মরত। ঘাটতি মেটাতে কর্মরত শিক্ষকরাই অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চাপ নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নেন। শুধু শিক্ষা খাতে নয়, বিভিন্ন দপ্তরেই সময়ভেদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়।’

আরও