ভারতে চিকিৎসা শেষে আবার কুষ্টিয়ার চেনা বাড়ি, পরিচিত উঠান, স্বজন আর কর্মক্ষেত্রে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। কিন্তু তার সেই ফিরে আসা আর আগের মতো হলো না। বাড়ি, স্বজন, সহকর্মী—সবই ছিল; শুধু ছিলেন না দেবাশীষ। ফিরলেন তিনি, তবে জীবনের স্পন্দন নিয়ে নয়—কফিনবন্দী নিথর দেহ হয়ে।
বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে গতকাল বিকাল ৫টার দিকে দেশে পৌঁছায় পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল শিখা ইনে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয় বাংলাদেশীর মরদেহ। যেখানে ছিল দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ।
কলকাতায় আগুনের ঘটনায় সাতজন বাংলাদেশী নিহত হন। তাদের মধ্যে একজনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে সেখানেই।
আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে চারটি মরদেহের তিনটি দেবাশীষের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় এবং পরে আফসানা ও আকরাম হোসেনের মরদেহ তাদের শ্বশুরবাড়ি থানা পাড়ায় নেয়া হয়।
এর আগে দুপুরেই দেবাশীষের সহকর্মী ও স্বজনরা বেনাপোল সীমান্তে পৌঁছান। তারা গ্রহণ করেন কফিন।
গতকাল রাত ১১টা নাগাদ কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসায় যখন সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ পৌঁছায়। একই রাতে তাদের সঙ্গে আফসানার বাবা আকরাম হোসেনের মরদেহও পৌঁছে স্বজনদের কাছে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজন, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড়ে ভারী হয়ে ওঠে আড়ুয়াপাড়ার পরিবেশ। ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির মরদেহ সামনে নিয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি দেবাশীষের বাবা দিলীপ দত্ত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতিকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
বৃদ্ধ বাবা বলেন, দেবাশীষের উপার্জনেই আমাদের পরিবার চলত। এখন আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। এই অবস্থায় সরকারের কাছে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ রাখেন তিনি।
সাত বছরের শিশু মহিমা দত্তকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আবেগঘন পরিবেশ। বাবা দেবাশীষ, মা আফসানা আর ছোট ভাই স্বর্ণশীষ—তিনজনই আর নেই, এই বাস্তবতার গভীরতা বোঝার বয়স এখনো হয়নি তার। স্বজনদের ভিড়ে শিশুটির সেই আকুতি আরো ভারী করে তুলছিল শোকের পরিবেশ।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শনিবার গভীর রাতে পৃথক ধর্মীয় রীতিতে চারজনের শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের সহকর্মী, স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষবারের মতো তাকে দেখতে ছুটে আসেন।
দৈনিক কুষ্টিয়ার সম্পাদক ড. আমানুর আমান বলেন, ‘দেবাশীষের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নেয়া অত্যন্ত কঠিন। একজন সাংবাদিকের মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন সহকর্মীকে হারাইনি, তার পুরো পরিবারই এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে। বিশেষ করে বাবা-মা ও ভাইকে হারিয়েছে তার ছোট্ট মেয়েটি—এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমরা শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাই।’
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর বলেন, আমাদের সহকর্মী দেবাশীষ দত্তসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথক ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি নিহত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের সদস্যদের ২৫ হাজার টাকা করে মোট ১ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিহত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মেয়ে মহিমার জন্য সরকারি সহায়তার বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।
চলতি মাসের ৩ তারিখ কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছোট ছেলে স্বর্ণশীষকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন দেবাশীষ। কয়েক দিন পর সেখানে যান তার শ্বশুর আকরাম হোসেনও। চিকিৎসা শেষে বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।