কোনো আনুষ্ঠানিক পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে ইরান যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে রোববার এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। খবর দ্য জেরুজালেম পোস্ট।
প্রতিবেদনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, সম্প্রতি জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্প এ বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে দূরে রাখা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা সম্ভব হলে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে প্রস্তুত ট্রাম্প।
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এ ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে তেহরান খুব শিগগিরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় শুরু করতে পারবে না বলেই বিশ্বাস করেন ট্রাম্প। এছাড়া ইরান গোপনে কোনো পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করলে তা মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ধরা পড়বে বলে ওয়াশিংটন আশাবাদী। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার ভয় তেহরানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে বলেও মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত করে দেয়, তবে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে তাদের প্রধান সামরিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করেছে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওয়াশিংটনের বর্তমান মূল অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা। তবে ইরান যদি পুনরায় জাহাজে হামলা চালায়, তবে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পথ খোলা থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমান পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকা পর্যন্ত ট্রাম্প কূটনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ধৈর্য ধরার নীতি বজায় রাখবেন। তবে ওয়াশিংটনের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলার ক্ষেত্রে ইরানের সাম্প্রতিক কঠোর শর্তগুলোর কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সম্মানজনকভাবে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের ইরান বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি ব্রিউ বলেন, ইরান বুঝে গেছে ট্রাম্প এই সংঘাতের অবসান চান। তাই তারা দর কষাকষিতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনর্নবীকরণ করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বার্তায় সংস্থাটির কমান্ডার মোহাম্মদ বাঘের জোলঘদর এ ঘোষণা দেন।
মার্কিন আচরণ সংশোধনের জন্য তিনি ৬টি শর্ত উপস্থাপন করেছেন। এগুলো হলো, এক, ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করা; দুই, ইরানকে যেকোনো ধরনের মৌখিক হুমকি দেয়া থেকে বিরত থাকা; তিন, সামরিক ও নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নেয়া এবং ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার; চার, যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ প্রদান; পাঁচ, ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ছয়, বিদেশে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের যাবতীয় সম্পদ অবিলম্বে মুক্ত করা।
এদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেও সংঘাত দ্রুত সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। ইরান আর বেশিদিন লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে না।
হরমুজ প্রণালি চালুর প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, জলপথটি একপ্রকার খোলাই রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর নেতৃত্বে সেখানে অবরোধ শিথিল ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবশ্য তারা (ইরান) যেকোনো সময় চাইলে কিছু না কিছু লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।