এবারো অকৃতকার্য বেশি গণিত ও ইংরেজিতে

বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে গণিত ও ইংরেজির দুর্বলতা। গতকাল প্রকাশিত ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে ফেল করেছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)—চারটি বিষয় সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে চলতি বছর পাসের হার সবচেয়ে কম ইংরেজিতে, ৭৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীই ইংরেজিতে ন্যূনতম ৩৩ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যের হারে ইংরেজির পরই রয়েছে গণিত। এ বিষয়ে পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফলে গণিতেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী ন্যূনতম পাস নম্বর অর্জন করতে পারেনি। তবে বাধ্যতামূলক অন্য দুই বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক ভালো। বাংলায় পাসের হার ৯৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি, ৯৯ দশমিক ১৭ শতাংশ।

ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর ফলাফলে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড সবচেয়ে খারাপ করেছে। বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ বোর্ডে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে গণিতে। বোর্ডটির ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীই এ বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এছাড়া ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।

এর কারণ জানতে চাইলে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরীক্ষার মূল্যায়ন যেভাবে হয়েছে, সেভাবেই ফল এসেছে। নম্বর বাড়িয়ে পাসের হার বেশি দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা হয়েছে এবার। তবে এর পরও মাদরাসা বোর্ডে কেন ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব। যেগুলোর শূন্য শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের ডাকা হবে। তাদের ফলাফলের মূল কারণ জানতে চাওয়া হবে। কীভাবে আগামীতে আরো বেশি শিক্ষার্থী ভালো করতে পারে সেটি নিয়েও কাজ করা হবে।’

অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ, রাজশাহী বোর্ডে ৭৪ দশমিক ৭, কুমিল্লা বোর্ডে ৮১ দশমিক ২৯, যশোর বোর্ডে ৭১ দশমিক ৮৪, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৭২ দশমিক ২৭, বরিশাল বোর্ডে ৬৯ দশমিক ২৪, সিলেট বোর্ডে ৬৯ দশমিক ১১, দিনাজপুর বোর্ডে ৭২ দশমিক ৯১, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬৬ দশমিক ৬৪ ও কারিগরি বোর্ডে ৯৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।

আর গণিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পাস করেছে ৮২ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া রাজশাহী বোর্ডে ৭৭ দশমিক ১৭, কুমিল্লা বোর্ডে ৮১ দশমিক ৭৫, যশোর বোর্ডে ৮৩ দশমিক ৩৪, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৮০ দশমিক শূন্য ৫, বরিশাল বোর্ডে ৭৭ দশমিক ৯৮, সিলেট বোর্ডে ৭৫ দশমিক ৯৬, দিনাজপুর বোর্ডে ৭১ দশমিক শূন্য ৫, ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬৯ দশমিক ৬১ ও কারিগরি বোর্ডে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে।

ইংরেজি ও গণিতে খারাপ ফলাফলের পেছনে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক বৃদ্ধি এবং মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বল ফলাফলের বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়গুলোয় এখনো বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষকের ঘাটতি আছে। অনেক সময় বাংলার শিক্ষক ইংরেজি বা গণিত পড়ান। এটি দূর করতে হবে। পাশাপাশি যথাযথ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণ শ্রেণীকক্ষে কতটা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সে মনিটরিং এখনো দুর্বল। অ্যাপের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক কর্মকর্তাদের দিয়ে মনিটরিং করা হলেও শ্রেণীকক্ষে এর প্রয়োগ কতটা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে।’

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৩-এও উঠে এসেছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইংরেজিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষকের হার মাত্র ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষকের হার ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ইংরেজির শিক্ষকদের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বিষয়ভিত্তিক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনধারী। গণিতেও প্রায় একই চিত্র উঠে আসে ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে। মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট গণিত শিক্ষকের মধ্যে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষকের হার ৫ দশমিক ৯৮ ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর হার ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। সে অনুযায়ী গণিতের শিক্ষকদের মধ্যে বিষয়টিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ।

আরও