চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার ইসলামপুর মহল্লার গৃহবধূ তাহারিমা বেগম। ১৯৮২ সালে শখের বশে একটি নকশিকাঁথা তৈরি করে বিক্রি করেছিলেন ১ হাজার ৩০০ টাকায়। কঠোর পরিশ্রম আর একাগ্রতায় তার তৈরি নকশিকাঁথা এরই মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে জয় করেছে দেশী-বিদেশী ক্রেতার মন। দীর্ঘ ৩৮ বছরের পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন নূর নকশী নামে একটি প্রতিষ্ঠান। পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সচ্ছল হয়েছেন দুই হাজারেরও বেশি নারী। বর্তমানে নকশিকাঁথার পাশাপাশি তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ডিজাইনের বেডশিট, পর্দা ও গৃহসজ্জার উপকরণ।
জানা গেছে, তাহারিমা বেগমের প্রতিষ্ঠানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলা, শিবগঞ্জ, নাচোল, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর ১৫টি এজেন্টের অধীনে ২ হাজার ২০০ নারী কাজ করছেন। ঘরে বসেই সংসারের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে আয় করছেন বাড়তি টাকা। তাদের কাছ থেকে এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করে আনা হয় জেলা শহরের ইসলামপুরের নূর নকশী বিক্রয়কেন্দ্রে। এরপর তা ছড়িয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। নকশিকাঁথার পাশাপাশি হোম ডেকর, হ্যান্ডিক্রাফটস ও নকশি ব্যাগ, চাদর, কুশন কভারসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয় ভারত, চীনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। অংশ নেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলায়ও। ২০১৮ সালে উড়িষ্যার প্রাদেশিক সরকারের আমন্ত্রণে এমএসএমই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করেন নারী উদ্যোক্তা তাহারিমা বেগম। তখন থেকেই উড়িষ্যায় বাণিজ্যিকভাবে তাহারিমার নকশিকাঁথা রফতানি শুরু হয়। সপ্তম জাতীয় এসএমই পণ্য মেলা-২০১৯-এ নারী ক্যাটাগরিতে বর্ষসেরা মাইক্রো উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কার পান তিনি।
মহল্লার এসএম আব্দুল বাকীর স্ত্রী তাহারিমা বেগম বলেন, ১৯৮২ সালে নিজের তৈরি একটি নকশিকাঁথা ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে পেরে আত্মবিশ্বাসী হই। কঠোর পরিশ্রমে গড়ে তুলেছি নকশিকাঁথার বিক্রয় কেন্দ্র ‘নূর নকশী’। স্বামী ও পরিবারের সবার সহযোগিতায় ৩৮ বছর ধরে এ কাজ করে যাচ্ছি। গ্রামের অসহায়, কর্মহীন নারীদের জন্য কিছু করতে পারাটা সব সময় আমার কাছে গর্বের। আমার আজকের এ অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে ঘরে বসে কাপড় আর রঙিন সুতায় ফোঁড় বোনা সব নারীর।
তিনি জানান, একেকটি নকশিকাঁথা তৈরিতে রকমভেদে সময় লাগে এক থেকে তিন মাস। এগুলোর দাম ৯০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০০ রকমের নকশিকাঁথা তৈরি হয়।
নূর নকশীর এজেন্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার চরমোহনপুর এলাকার মো. মোস্তফা বলেন, আমার অধীনে প্রায় ৩৫০ জন নারী নকশিকাঁথা তৈরির কাজ করেন। তাদের কাপড়, সুতা দিয়ে আসি। এরপর তৈরি শেষ হলে নূর নকশী বিক্রয় কেন্দ্রে বিক্রি করা হয়। এতে এজেন্ট হিসেবে প্রত্যেক কাঁথায় আমার ২০০-৩০০ টাকা লাভ থাকে। পাশাপাশি নারীদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে।
গৃহবধূ মুক্তারা খাতুন বলেন, সংসারের সব কাজ দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এরপর হাতে আর তেমন কাজ থাকে না। এ অবসর সময়েই নকশিকাঁথার কাজ করি। মাসে কমপক্ষে একটি কাঁথা তৈরি করতে পারি, যা থেকে ৭০০-৮০০ টাকায় আয় হয়।
নবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী রওশন আরা পপি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে কলেজ বন্ধ রয়েছে। তাই মা আর দাদির সঙ্গে আমিও নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করি। গত আট মাসে ভালোই আয় হয়েছে।
জেলা পরিষদের সদস্য ও সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শান্তনা হক নূর নকশী বিক্রয় কেন্দ্রের নিয়মিত ক্রেতা। আত্মীয়কে উপহার দিতে গত শনিবার বিক্রয়কেন্দ্রে একটি নকশিকাঁথা কিনতে এসেছেন তিনি। শান্তনা হক বলেন, এখানকার নকশিকাঁথার মান অনেক ভালো। তাছাড়া অনন্য ডিজাইন ক্রেতাকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আজাদ হোসেন বলেন, বিসিকের প্রধান কাজই উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিসিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ঋণের ব্যবস্থাসহ নানা দিকনির্দেশনা দেয়। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গর্ব নূর নকশীর তাহারিমা বেগম। অনেক সংগ্রাম করে আজ এ অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে নূর নকশী সারা দেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। এমনকি বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। আমরা চাই তাহারিমা বেগমকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে জেলার নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে এগিয়ে আসবে।