রংপুরের বৈরালি মাছের জিআই স্বীকৃতি দাবি

দেশী মাছের মধ্যে তিস্তা নদীর বৈরালি অন্যতম। খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতা পর্যায়ে মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বৈরালি মাছের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসেবে স্বীকৃতির দাবি বিশেষজ্ঞদের।

দেশী মাছের মধ্যে তিস্তা নদীর বৈরালি অন্যতম। খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতা পর্যায়ে মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে বৈরালি মাছের উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে জিআই পণ্য (ভৌগোলিক নির্দেশক) হিসেবে স্বীকৃতির দাবি বিশেষজ্ঞদের।

জিআই হলো ভৌগোলিক নির্দেশক চিহ্ন, যা কোনো পণ্যের একটি নির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থলের কারণে এর খ্যাতি বা গুণাবলি নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত জিআইতে উৎপত্তিস্থলের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। ৯ জানুয়ারি জিআই পণ্য হিসেবে টাঙ্গাইলের চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলকে স্বীকৃতি দেয়ায় বর্তমানে দেশে মোট জিআই পণ্য হচ্ছে ২১টি। ২০২১-২২ অর্থবছরের মাঝামাঝি একবার রংপুর মৎস্য অফিস থেকে বৈরালি মাছের জিআই স্বীকৃতির জন্য প্রাথমিক আলোচনা শুরু হলেও তা অজ্ঞাত কারণে বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সাধু পানি উপকেন্দ্র, সৈয়দপুর এবং রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৈরালি মিঠাপানির মাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম barilius barila যা স্থান ভেদে বারালি, ককসা ইত্যাদি নামে পরিচিত। দেশের উত্তর জনপদে মাছটি বৈরালি বা বারালি নামে পরিচিত। মিঠাপানির জলাশয় বিশেষ করে পাহাড়ি ঝরনা ও অগভীর স্বচ্ছ নদী এদের আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মাছটি সুস্বাদু এবং অণুপুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ হওয়ায় রংপুর অঞ্চলে খুব জনপ্রিয়। মাছটির প্রজননকাল নভেম্বর-মার্চ পর্যন্ত। চার প্রকারের বৈরালি মাছ পাওয়া যায়। প্রতিটি মাছ ৪-৫ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। ওজন ৪০-৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়।

সাধু পানি উপকেন্দ্র সৈয়দপুরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আজাহার আলী বলেন, ‘মূলত তিস্তা নদী ও চিকলী, ঘাঘট এবং বুড়ি তিস্তা নদীতেও বৈরালি মাছ পাওয়া যায়। বিশেষ করে লালমনিরহাট এবং নীলফামারীর তিস্তা ব্যারাজ এলাকা ও রংপুরের গঙ্গাচড়া এবং কাউনিয়ায় বৈরালি মাছ পাওয়া যায়। ব্যাপক চাহিদা থাকায় সবসময় ছোট আকারের মাছ ৫০০ টাকা কেজি এবং বড় আকারের মাছ ৮০০-৯০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। দামের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে অনেকটা ইলিশ মাছের সমতুল্য। তাই আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এ মাছ ব্যাপক অবদান রাখতে পারে।’

তিস্তা নদীসংলগ্ন জেলেপাড়ার বাসিন্দাদের জিআই সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও অধিকাংশ জেলেদের অভিমত, তিস্তা নদীর মাছ বিক্রি করতে চাইলে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ বৈরালি।

গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের জেলে পাড়ার বাসিন্দা লাল মিয়া জানান, বংশপরম্পরায় তিনিও মাছ ধরার সঙ্গে সম্পৃক্ত। জিআই না বুঝলেও বৈরালি মাছের বংশ বৃদ্ধিতে ভালো কিছু করা উচিত বলে অভিমত তার।

রিভারাইন পিপলের পরিচালক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘সুস্বাধু বৈরালি মাছের কথা উঠলেই মূলত রংপুর অঞ্চলের কথা ভেসে ওঠে। এ অঞ্চলের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র এবং ধরলা নদী ঘিরেই মাছটি টিকে আছে। মাছটি রংপুরের জিআই হিসেবে পরিচিত হওয়ার অন্যতম দাবিদার।’

প্রায় দুই বছর আগে বৈরালি মাছের জিআই বিষয়ে রংপুর মৎস্য অফিস থেকে উদ্যোগী হলেও বর্তমানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। এ বিষয়ে জানতে মৎস্য কর্মকর্তা বরুণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘রংপুরে থাকাকালীন জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায়  বৈরালি মাছ নিয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। ওই সময় গঙ্গাচড়া এবং কাউনিয়া উপজেলায় তিস্তা নদীতে জরিপ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বদলিজনিত কারণে কার্যক্রম আর এগোয়নি।’

বৈরালি মাছের জিআই পাওয়ার জন্য আবেদন করবেন কিনা জানতে চাইলে রংপুর বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রংপুরের পণ্য হিসেবে বৈরালি মাছ চিহ্নিত হোক তা আমিও চাই। তবে এর আগে জিআই পেতে যে যোগ্যতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে কাজ করতে হবে।’


আরও