সরকারের ১০০ দিনে গৃহীত বেশির ভাগ কার্যক্রমে হতাশাজনক চিত্র: টিআইবি

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমলাতন্ত্রের একটি অংশ এবং ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সম্মতিকে বাস্তবায়ন করতে দ্রুত একটি জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। নাহলে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও সামগ্রিকভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আজ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে যেমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার অভাবে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, গত ২৭ মে পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রমের ভিত্তিতে এ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের ১০০ দিন পার হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বিশেষ করে আইন অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে দুদক পুনর্গঠন করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিন মাস পার হয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন নিয়োগে দলীয় বিবেচনার পুরোনো ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং স্থানীয় সরকারের প্রশাসক নিয়োগে পেশাদারত্বের তুলনায় রাজনৈতিক বিবেচনা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করাকে সরকারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছে টিআইবি। একই সঙ্গে সাইবার সুরক্ষা আইন ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনের মতো বিতর্কিত আইন সংশোধন না করে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সংস্থাটির মত।

টিআইবি বলেছে, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকলেও গণপিটুনি, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধ করা যায়নি। ৫ আগস্টের পর মাজার ও পীরদের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়ার ঘটনায় সরকার প্রয়োজনীয় কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেও সংস্থাটি মনে করে। ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশের মধ্যে ‘সবই আমাদের’ মানসিকতার কারণে দখলবাজি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রতিবেদনে কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রোটোকল সীমিত করা, পরিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাতিল, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরাতে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি, সরকারি কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্ব ও আলোচনায় সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমলাতন্ত্রের একটি অংশ এবং ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সম্মতিকে বাস্তবায়ন করতে দ্রুত একটি জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। নাহলে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি।

আরও