চট্টগ্রামে দুধ উৎপাদন বাড়লেও ভোক্তার দৈনিক চাহিদায় ঘাটতি

গত দেড় দশকে চট্টগ্রামে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। গড়ে একজন মানুষের দৈনিক দুধের চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার। সেখানে ভোক্তারা পাচ্ছে মাত্র ২০৩ মিলিলিটার। দুধ উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের দৈনিক প্রাপ্যতায় এ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গত দেড় দশকে চট্টগ্রামে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। গড়ে একজন মানুষের দৈনিক দুধের চাহিদা ২৫০ মিলিলিটার। সেখানে ভোক্তারা পাচ্ছে মাত্র ২০৩ মিলিলিটার। দুধ উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাদের দৈনিক প্রাপ্যতায় এ প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুধের পুষ্টিগুণ অন্য খাবার দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়। সেজন্য একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষকে নিয়মিত দুধ পানের কথা বলা হয়। কিন্তু দৈনিক খাদ্যতালিকায় দুধের যদি ঘাটতি থাকে তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের পুষ্টিশূন্যতা তৈরি হতে পারে। সবার জন্য দুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তারা।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম জেলায় দুধ উৎপাদন হয়েছিল ৬ দশমিক ৮ টন। অথচ জেলার জনসংখ্যা অনুযায়ী দুধের চাহিদা ছিল ৮ দশমিক ৩৬ লাখ টন। অর্থাৎ গত অর্থবছরে জেলায় দুধের ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ৫৬ লাখ টন। অন্যদিকে ভোক্তার প্রাপ্যতা জনপ্রতি প্রতিদিন ২৫০ মিলিলিটার হলেও ভোক্তা পেয়েছেন ২০৩ দশমিক ৩২ মিলিলিটার। অর্থাৎ চট্টগ্রামের প্রতিজন ভোক্তার দুধের ঘাটতি প্রায় ৪৬ দশমিক ৬৮ মিলিলিটার। ২০২১-২২ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয় ৬ লাখ ১৫ হাজার টন। সেখানে চাহিদা ছিল ৭ লাখ টন। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৮৫ হাজার টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভোক্তাপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ছিল ২১৬ দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম এবং ঘাটতি ছিল ৩৩ দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম।

এদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ছিল ৩ দশমিক ৭২ লাখ টন এবং চাহিদা ছিল ৪ দশমিক ৬০ লাখ ঘাটতি ছিল ৮৮ হাজার টন। অন্যদিকে ভোক্তাপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ছিল গড়ে ২২০ মিলিগ্রাম এবং ঘটতি জনপ্রতি প্রায় ৩০ মিলিগ্রাম করে।

চট্টগ্রাম প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রামে জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা চাহিদার তুলনায় কম আছে। সে কারণে প্রতিবেদনে দুধের উৎপাদন বাড়িয়ে জনপ্রতি প্রাপ্যতা ২৫০ মিলিগ্রাম নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দুধের প্রাপ্যতা প্রতিজন ২১৬ দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২২০, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩০, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪০ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫০ মিলিগ্রাম দৈনিক চাহিদা ভোক্তার জন্য নিশ্চিত করা হবে। এজন্য বিএলআরআই, মিল্কভিটা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা দুধের 

উৎপাদন বাড়াবে।

বার্ষিক মূল্যায়নে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জনপ্রতি দুধের চাহিদা ২২০ মিলিগ্রামে উন্নীত করার কথা থাকলেও সেটা দাঁড়িয়েছে ২০৩ দশমিক ৩১ মিলিগ্রামে, যা ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী যেখানে ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী দুধের জোগান বাড়ানোর কথা সেখানে উল্টো ভোক্তার দুধের জোগান কমে এসেছে।

অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ২২১ দশমিক ৮৯ মিলিলিটার সেখানে চট্টগ্রামের ভোক্তাদের জনপ্রতি দুধের প্রাপ্যতা ২০৩ দশমিক ৩১ মিলিলিটার। অর্থাৎ দেশব্যাপী জনপ্রতি প্রাপ্যতার তুলনায় চট্টগ্রামের মানুষ দুধের প্রাপ্যতা প্রায় ১৮ দশমিক ৫৮ মিলিগ্রাম কম। দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৮ হাজার টন এবং চাহিদা ছিল ১ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ দুধের ঘাটতি প্রায় ১৮ লাখ টন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেলায় গত দেড় দশকে দুধের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ। একজন মানুষের গড়ে দৈনিক ২৫০ মিলিগ্রাম দুধের চাহিদা রয়েছে। সেখানে চট্টগ্রাম জেলায় ভোক্তার প্রাপ্যতা কম আছে। চলতি অর্থবছরে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হবে। চট্টগ্রামে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় দুধের উৎপাদন আরো বাড়াতে হবে। সেজন্য সরকারি ডেইরি ফার্মের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ডেইরি ফার্মে উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। কেননা দুধের ঘাটতি থাকলে সেই পুষ্টি অন্য বিকল্প খাবার দিয়ে পূরণ সম্ভব হয় না। চট্টগ্রামে প্রায় ১০ হাজার ডেইরি ফার্ম আছে। দুধের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আমরা সবসময় খামারিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’

খামারিরা বলছেন, চট্টগ্রামের ডেইরি ফার্মের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে কভিড পরবর্তী অনেক খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন খামারিরা। দুধের হয়তো সামগ্রিক উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনের সঙ্গে চাহিদার ঘাটতি বাড়ছে ক্রমশ। গাভীর লালন-পালন খরচ বেড়ে যাওয়া, গো-খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিল ছাড়াও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে দুধের ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বড় বড় কিছু কোম্পানি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে দুধের চাহিদা স্বাভাবিক রাখার জন্য। কিন্তু এক লিটার দুধ এখন ৮০-১০০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সব ক্রেতা চাইলেও এতো দাম দিয়ে দুধ হয়তো কিনতে পারছেন না। আবার খরচ মিটিয়ে খামারিরা যে দুধের দাম কমিয়ে নিয়ে আসবেন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে দুধের ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না।


আরও