ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায় সরকার। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
আজ শনিবার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাভার ক্যাম্পাসে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত ‘কানেক্টিং নলেজ, পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ফর বেটার গভর্ন্যান্স’ শীর্ষক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক, উন্নয়নকর্মী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবীরা অংশ নেন।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যে ছেয়ে গেছে। বাংলাদেশে জ্বালানি থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই স্বজনশীলতা ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়েও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তাই বৈষম্য কমানো, সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা এবং সবার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি।
শাসকরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন—এর মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয়েছে যে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। প্রতিষ্ঠান মানে শুধু আইন, বিধি বা সাংগঠনিক কাঠামো নয়; এর সঙ্গে রীতি-রেওয়াজ ও মূল্যবোধও জড়িত। তাই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান নিয়েই গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়া হয়েছে এবং সেখানে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, গভর্ন্যান্সের ধারণা নতুন নয়। আকবরের আমলের ‘আইন-ই-আকবরী’, কনফুসিয়াস, নিজামুল মুলক, তিরুভল্লুভর ও ইবনে খালদুনের লেখায় সুশাসনের বিভিন্ন দিক পাওয়া যায়। তবে ভালো শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্রশাসন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসহ সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই শাসনব্যবস্থার সমস্যা রয়েছে। শুধু ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন আস্থা, ন্যায়নীতি ও জবাবদিহি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থা ও অলিগার্কি থাকলে ভালো শাসন নিশ্চিত করা কঠিন। তাই ‘গুড গভর্ন্যান্স’-এর পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক ‘গুড এনাফ গভর্ন্যান্স’-এর বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের পরিচালক আব্দুল বাকি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে পরিবর্তন চলছে, তা ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু সুশাসনের কথা বললেই হবে না, বাস্তবে কী ঘটছে জনগণ তা দেখতে ও বুঝতে চায়।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির বলেন, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সামাজিক প্রভাব তৈরির যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষা দেয়া নয়; জ্ঞান সৃষ্টি, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব তৈরি এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবদান রাখাও এর দায়িত্ব।
তিনি জানান, সিজিএস গবেষণা, নীতি সংলাপ ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে গবেষক, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়নকর্মীদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনবে। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, শিল্প ও জননীতির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রমাণভিত্তিক সংস্কার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কেন্দ্রটি ভূমিকা রাখবে।