২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান ওশান টুনা কমিশনের (আইওটিসি) সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাছ ধরার অধিকার পেয়েছে। তবে গভীর সাগরে সে অনুপাতে বাড়ছে না মাছ আহরণ। সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার টন মাছ আহরণ হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার টনে। সবচেয়ে বেশি আহরণ কমেছে ইলিশ। তিন বছরে আহরণ ৮ হাজার ১৩৮ টন থেকে নেমে এসেছে ১ হাজার ৭৯০ টনে, যা প্রায় ৭৮ শতাংশ কম। এতে সংকটে পড়েছে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রে মাছের খাবারের বড় একটি অংশই আসে দেশের ১১৯টি নদ-নদী থেকে। নদ-নদীগুলোর সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ রয়েছে। মোহনাগুলো চর পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রে মাছের খাবার সরবরাহ কমেছে। এ কারণে গভীর সাগরে মাছের আধিক্য কমে এসেছে। এছাড়া সমুদ্র জয়ের এলাকায় বৈদেশিক জাহাজগুলো যাতে প্রবেশ করতে না পারে এবং দেশীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে আধুনিকায়ন করলে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের বিগত সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ লাখ ৭ হাজার ২৩৬ টন মাছ আহরণ করে বাণিজ্যিক জাহাজ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৪ টনে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ লাখ ১৯ হাজার ১২১, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১৭০ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন মাছ আহরণ করা হয়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন মাছ সমুদ্র থেকে আহরিত হয়। একসময় সমুদ্র থেকে ১১২-১১৭ প্রজাতির মাছ আহরণ করা গেলেও বর্তমানে সেটা নেমে এসেছে ৫৫-৫৭টিতে।
সমুদ্রে থেকে বাণিজ্যিক জাহাজে সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করা হয়। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ হয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টন। অর্থাৎ অর্থবছরের ব্যবধানে সমুদ্র থেকে বড় জাহাজে মাছের আহরণ বেড়েছে মাত্র ১ হাজার ৮৪৬ টন বা ১ দশমিক ৬১ শতাংশ। বিগত অর্থবছরের তুলনায় সমাপ্ত অর্থবছরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেও আহরণ স্থিতিশীল থাকায় মাছের মজুদ ক্রমেই কমছে। বাণিজ্যিক জাহাজে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মাছ আহরিত হয়েছিল ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন।
সামুদ্রিক মাছের মধ্যে ইলিশের চাহিদা সবসময় বেশি। তবে গত দুই অর্থবছরে সমুদ্র থেকে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণ করা যায়নি। শেষ তিন অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজে ইলিশ আহরণ হয় ৮ হাজার ১৩৮ টন। সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৬৮ টন ও সমাপ্ত অর্থবছরে ধরা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭৯০ টন ইলিশ। এ তিন অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমেছে ৬ হাজার ৩৪৮ টন বা ৭৮ শতাংশ। একই অবস্থা ইলিশসদৃশ সার্ডিন মাছেরও। মাছটি ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫০ হাজার ৭৮৩ টন ধরা গেলেও সমাপ্ত অর্থবছরে ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৫৬৪ টন। অর্থাৎ তিন বছরে আহরণ কমেছে ২২ হাজার ২১৯ কেজি বা ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। যদিও বছরের ব্যবধানে আহরণ বেড়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার কেজি।
অন্যদিকে ইলিশ, সার্ডিনের পাশাপাশি সামুদ্রিক চিংড়ির চাহিদাও রয়েছে বাজারে। সমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ২২ টন চিংড়ি আহরণ হয়েছে। গত অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৯৫৪ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ হাজার ৬৪৬ টন ক্যাটফিশ ধরা হলেও সমাপ্ত অর্থবছরে হয়েছে ২ হাজার ৫২৪ টন। এছাড়া অন্যান্য মাছের মধ্যে রূপচাঁদা ৯৩৬ টন, লইট্টা ২ হাজার ৬৪৪, চইক্যা ১২ হাজার ৬৬, ছুরিমাছ ৪ হাজার ৬৩৫, পোয়া মাছ ৪ হাজার ১২০, আইলা ৫ হাজার ১৯ টনসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আহরণ করা হয়েছে সামুদ্রিক জাহাজের মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের নিবন্ধিত বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে ২৬৬টি। যার মধ্যে নিবন্ধন আছে ২২০-২৩০টির। জাহাজগুলোর কন্ডিশন, লোকবল ও অন্যান্য সংকটের কারণে ২৩২টির মতো জাহাজ সমুদ্রে নিয়মিত মৎস্য আহরণের জন্য যাচ্ছে। এর মধ্যে স্টিলের জাহাজ রয়েছে ১৭০টি ও কাঠের জাহাজ ৬২টি। কয়েকটি জাহাজ এক বা দুই ট্রিপ গিয়ে পরে আর যেতে পারছে না আর্থিক সংকটের কারণে। অন্যদিকে সমুদ্রে যান্ত্রিক (ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন) নৌযানের অনুমোদন আছে প্রায় ৬৬ হাজারের মতো।
সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. শওকত কবির চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত অর্থবছরের তুলনায় সমাপ্ত অর্থবছরে সামুদ্রিক মাছ আহরণের পরিমাণ বেশি। তবে সমুদ্রের আবহাওয়া এপ্রিল-মে থেকে প্রতিকূলে থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মাছ ধরতে পারেনি। এ কারণে আহরণ কমেছে। অন্যদিকে ফিশিংয়ের জায়গা একই হওয়ায় মাছের মজুদ কিছুটা কমে থাকতে পারে। সেটা নিশ্চিত না হলেও সমুদ্রে মাছের কিছুটা ঘাটতি হয়তো রয়েছে। আমাদের জাহাজগুলোর আরো বেশি সক্ষমতা প্রয়োজন।’
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা জয় করলেও বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মাত্র ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারে মাছ ধরে। প্রতি বছর একই এলাকায় মাছ ধরায় বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাছাড়া ২৭ হাজার বর্গ কিলোমিটারের বাইরে গিয়ে মাছ ধরার সক্ষমতা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নেই।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমুদ্র উপকূল অংশে মাছ আহরণের পরিমাণ বেড়েছে। ওভার ফিশিংয়ের কারণে মাছ বড় হচ্ছে না। এজন্য গভীর সমুদ্রে বড় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি মৎস্য জোনে আগের মতো ভালো মানের মাছ নেই। তাছাড়া সমুদ্রে মাছের খাবারের জায়গা দূষণের কারণে অভয়াশ্রম নষ্ট হচ্ছে।’