রাজধানীর পুরান ঢাকার বাসিন্দা আসমা আক্তার। পেশায় গৃহিণী। প্রতি বছরই সপরিবারে গ্রামে গিয়ে ঈদ উদযাপন করেন। তবে দুই বছর ধরে ঢাকায় ঈদ করছেন তিনি। গ্রামে না যাওয়ার বড় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সন্তানরা এখন আর সেভাবে গ্রামে গিয়ে ঈদ করতে চায় না। তাছাড়া আমার স্বামী ব্যবসা করেন। ঈদের পরও দোকান রাখতে হয়।
সবকিছু মিলিয়ে গ্রামে গিয়ে ঈদ করার ব্যাপারটি আমাদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। শুধু আসমা আক্তার নন, অনেক মানুষই এখন আর ঈদে আগের মতো গ্রামে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন না। নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার ঈদ সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আসছে। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আকুতি হ্রাসের পাশাপাশি মানুষ এখন দেশ-বিদেশের পর্যটন এলাকায় ছুটি কাটানোর দিকে ঝুঁকছে।
গ্রামের সঙ্গে এভাবে সম্পর্ক আলগা করে দেয়ার বিষয়টি সাংস্কৃতিক দিক থেকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ঢাকার ঈদে এক ধরনের রূপান্তর ঘটছে। একটা সময় মানুষ ছুটি পেলে, বিশেষ করে ঈদ, শীত-গ্রীষ্ম এসব উৎসবে গ্রামে ছুটে যেত। কিন্তু এখন সে প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসছে। এর পেছনে অবশ্যই রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনাও বড় কারণ বলে মনে করছেন তারা। গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর সৌন্দর্যের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় পলিসিতে না থাকার কারণেই মানুষের মন থেকে গ্রামের আবেদন হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন অনেকটাই গ্রামবিমুখ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এ প্রজন্মের বেড়ে ওঠা ঢাকায়। আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি, আমাদের একটা টান থাকে গ্রামের প্রতি। ছুটি পেলেই আমরা গ্রামে চলে যাই। কিন্তু এখনকার প্রজন্ম গ্রামে যেতে চায় না। আমরা যতই বলি, ঢাকা দূষণের শহর, মন্দ শহর, তবুও এ তরুণরা ঢাকাকেই ভালোবাসে।
তিনি আরো বলেন, সব কিছুরই পরিবর্তন হয়। ঢাকার ঈদ সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসছে। আগামীতে হয়তো আরো অনেক কম মানুষ গ্রামে যাবে। আসলে গ্রামের বিষয়টি আমাদের নীতিনির্ধারকরা সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। যদিও নীতিনির্ধারকদের বেশির ভাগই গ্রামে বড় হয়েছেন। কিন্তু তাদের চিন্তায় গ্রাম নেই।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে গ্রাম সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে আধুনিক ভোগবাদী দর্শনের প্রভাবে মানুষ এখন গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ঢিলে করে ফেলছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক মন্তব্য করে ড. আদিল বলেন, সবারই শেকড় থাকে। আমাদের শেকড় গ্রাম। গ্রামের সঙ্গে এভাবে সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই খারাপ হবে। বিশ্বের সব উন্নত দেশেই গ্রামীণ জীবনের আলাদা স্নিগ্ধতা দেখা যায়। আমরা সে স্নিগ্ধতা হারিয়ে ফেলছি।
ঢাকার ঈদ পরিবর্তনের সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আরেকটি বিষয় ফুটে উঠেছে। মানুষ গ্রামে যাওয়ার বদলে বিনোদনের জন্য দেশের পর্যটন স্পট কিংবা দেশের বাইরের পর্যটন স্পটে ঘুরতে যেতে পছন্দ করছে বেশি। এর নানা কারণ ব্যাখ্যা করেছেন নগর গবেষকরা।
ধানমন্ডির বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার আশফাক হোসেন বলেন, শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় অবসর কম। ঈদ-পার্বণে লম্বা ছুটি পাওয়া যায়। সেটাকে কাজে লাগিয়েই মানুষ দেশ-বিদেশে ঘুরতে যায়।
ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাপের শহর ঢাকায় তেমন বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া গ্রাম ও মফস্বল হারিয়েছে তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। মফস্বলেও লেগেছে শহুরে চাপের ছোঁয়া। ফলে মানুষ নিজেকে ফিরে পেতে গ্রামের বদলে বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় ভিড় জমায়। এছাড়া গ্রামে যাদের নিকটাত্মীয় আছে কিংবা সম্পত্তি আছে, তারাই সময় করে গ্রামে খোঁজখবর নিতে আসেন। আর যাদের শহরে এক টুকরো জমি বা একটি ফ্ল্যাট আছে, তারা গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা রাখেন না বললেই চলে।
সরকারের পরিকল্পনায় গ্রামকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শহরে যেভাবে দূষিত পরিবেশ, বিষাক্ত বায়ু আছে, গ্রামে তা নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রামবিমুখতা ভালো খবর নয়। কেননা আমরা বারবার বলছি ঢাকা বিকেন্দ্রীকরণের কথা। যে মানুষ রংপুর থেকে ঢাকায় আসে কিংবা রংপুর থেকে ইউরোপে গিয়ে বসতি গড়েছে, তাকে যদি মানসম্মত জীবনধারণের নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাহলে সে অবশ্যই আবার ঢাকা থেকে রংপুরে গিয়ে বসতি গড়তে সম্মত হবে। এজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত আর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।