অধ্যাপক ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু একজন চিকিৎসক, রাজনীতিক ও সংসদ সদস্য। দীর্ঘদিন চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি তিনি পেশাজীবী ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও সক্রিয়। গত মাস থেকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করার পর রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা কী ছিল?
চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। এ পেশায় কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেয়া, চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি। মানুষের অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণের বৃহত্তর লক্ষ্য থেকেই রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমি মনে করি, চিকিৎসা পেশার অভিজ্ঞতাকে জনসেবার বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব।
আপনার রাজনৈতিক পথচলা সম্পর্কে জানতে চাই।
আমার রাজনৈতিক পথচলার শুরু ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে। ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছি এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক সমাজের পেশাজীবী আন্দোলন ও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছি। চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হওয়া আমার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার সুযোগ আরো বিস্তৃত হয়েছে।
চিকিৎসক হিসেবে আপনার পেশাগত অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণে কীভাবে কাজে লাগবে?
চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে রোগী, চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান—তিন পক্ষেরই বাস্তব সমস্যাগুলো বুঝতে সাহায্য করেছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করা, চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং রোগীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা সম্ভব। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব হলো মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত সুপারিশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়ে আপনার অবস্থান কী?
চিকিৎসার ব্যয় যেন কোনো পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ না হয়, সেটি নিশ্চিত করা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য চিকিৎসা ব্যয় অনেক সময় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রতিষ্ঠায় ধাপে ধাপে এগোনো যেতে পারে। স্বাস্থ্যবীমা চালুর ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, অর্থায়নের উৎস, সুবিধাভোগী নির্বাচন, সেবার মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকাকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা নির্ভরতা কমাতে কী করা প্রয়োজন?
দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নত চিকিৎসার জন্য মানুষের ঢাকামুখিতা। এর প্রধান কারণ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উন্নত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা। এ পরিস্থিতি বদলাতে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের আবাসন, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা জরুরি। পাশাপাশি জেলা হাসপাতালগুলোতে বিশেষজ্ঞ বিভাগ, ডায়াগনস্টিক সুবিধা, জরুরি সেবা ও নিবিড় পরিচর্যার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। টেলিমেডিসিন ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার বাড়লে মানুষ স্থানীয় পর্যায়েই মানসম্মত সেবা পাবেন এবং ঢাকার ওপর চাপ কমবে।
সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের সংকট মোকাবেলায় পরিকল্পনা কী?
এ সমস্যা মোকাবেলায় প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনা, সঠিক ক্রয় ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সংসদীয় কমিটির দায়িত্বের আওতায় মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা সম্ভব। লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকারি হাসপাতালে আসা কোনো রোগী যেন কেবল ওষুধ বা পরীক্ষার উপকরণ না থাকার কারণে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তিতে না পড়েন। অকেজো যন্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত এবং হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় ও সেবার মানের বৈষম্য কমাতে কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন?
সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে ব্যয় ও সেবার মানের পার্থক্য কমাতে উভয় খাতের জন্য কার্যকর নীতিমালা ও জবাবদিহি প্রয়োজন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সেবার মান, লাইসেন্স, রোগীর নিরাপত্তা এবং বিলিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা ও পরীক্ষার ফি সম্পর্কে রোগীকে আগেই স্পষ্ট ধারণা দেয়া এবং অযৌক্তিক ব্যয় প্রতিরোধে কার্যকর তদারকি থাকা প্রয়োজন।
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ধরে রাখার বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের ধরে রাখতে তাদের নিরাপদ ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, আবাসন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজের জন্য বাস্তবসম্মত প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালগুলোর বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে হবে, যাতে রোগীরা ছোটখাটো চিকিৎসার জন্যও ঢাকায় যেতে বাধ্য না হন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন।
চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্কের অবনতি, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক সহিংসতা কমাতে কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?
হাসপাতালগুলোতে রোগী ও স্বজনদের জন্য তথ্য কেন্দ্র, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং চিকিৎসার অগ্রগতি জানানোর উপযুক্ত পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও পেশাগত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তা, জরুরি বিভাগে শৃঙ্খলা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যোগাযোগ দক্ষতা এবং রোগীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কোনো অভিযোগের বিচার আইনসম্মতভাবে হওয়া উচিত; সহিংসতা কখনই গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে।
হাম ও ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় নজরদারি, টিকাদান, রোগী ব্যবস্থাপনা ও হাসপাতালের প্রস্তুতি কতটা জোরদার করা প্রয়োজন?
হাম ও ডেঙ্গুর মতো রোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে রোগ দুটির প্রকৃতি ভিন্ন হওয়ায় প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় আলাদা কৌশল প্রয়োজন। হামের ক্ষেত্রে নিয়মিত টিকাদান জোরদার, টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করা এবং টিকাদানের তথ্য হালনাগাদ রাখা জরুরি।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, রোগের প্রবণতা বিশ্লেষণ, জনগণের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনুযায়ী শয্যা, প্রশিক্ষিত জনবল, পরীক্ষার সুবিধা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণের প্রস্তুতি রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এসব রোগ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত প্রস্তুতি ও মূল্যায়নে জোর দেয়া উচিত।
বর্তমান দায়িত্বে স্বাস্থ্য খাতে কোন পরিবর্তনগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চান?
আমি চাই, দেশের মানুষ যেন আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন। একজন দরিদ্র মানুষও যেন সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং ওষুধ পাওয়ার সুযোগ পান—এটাই আমার দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো আরো সক্ষম হয়ে উঠুক, চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থা বাড়ুক এবং স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক। গাজীপুর-৩ আসনেও উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো ও স্থানীয় পর্যায়ে সেবার সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।