সাইবার বুলিং প্রতিরোধসহ নারীর নিরাপত্তায় নানা প্রতিশ্রুতি দলগুলোর

দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি নারী। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী ভোটারদের আকর্ষণ করতে এরই মধ্যে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।

দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি নারী। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নারী ভোটারদের আকর্ষণে রাজনৈতিক দলগুলো নারীর নিরাপত্তা, ধর্ষণ-নির্যাতন প্রতিরোধ, সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি বন্ধ, কর্মক্ষেত্র ও গণপরিবহনে হয়রানি রোধ, শিক্ষা-সুবিধা বাড়ানোসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট নারী প্রতিনিধিত্বের ছবিতে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫–এ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন এবং পরের নির্বাচনে তা ন্যূনতম ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলগুলো। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী হয়েছেন ৮৫ জন। যা মোট প্রার্থীর প্রায় ৪ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই; জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও নারী প্রার্থী দেয়া হয়নি। সর্বোচ্চ ১০ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি; জাতীয় পার্টির ৬, এনসিপির ২, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ১০, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ৬ এবং বাসদের ৫ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন।

নারী অধিকারসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ইশতাহারে প্রতিশ্রুতির তালিকা বড় হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, কার্যকর কাঠামো ও সময়সীমা ছাড়া এ প্রতিশ্রুতিগুলো শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী ভাষ্য হয়েই থেকে যেতে পারে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইশতাহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনটি দলই নারীর শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। বিশেষত নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিশেষ জোর দিয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি তাদের ইশতাহারে বলেছে, লিঙ্গভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতা, বিদ্বেষ এবং বুলিং নিরোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বাস্তবায়ন করবে, ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘নারী সাপোর্ট সেল’ প্রতিষ্ঠা করার কথাও বলেছে দলটি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলছে, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিতে জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠন করে সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিতকরণে প্রকল্প নেয়া ও একটি মাল্টিপারপাস মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু করার কথা বলছে দলটি। যার মাধ্যমে বিশেষ ইমার্জেন্সি নম্বরে কল দিয়ে বা অ্যাপ থেকে ২৪ ঘণ্টা অভিযোগ করা যাবে। এছাড়া শহরজুড়ে ইমার্জেন্সি পোল স্থাপন করা হবে, যার নির্দিষ্ট বাটন চাপলেই সহায়তা পৌঁছে যাবে মুহূর্তেই। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি বলছে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, অনলাইন ও যানবাহনে নারীদের হয়রানি ও নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর শাস্তির বিধান এবং ভিকটিমদের ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে গণমাধ্যম নীতিমালা জারি করা হবে। অনলাইন হ্যারাসমেন্ট প্রতিরোধে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট সেন্টার ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) সক্ষমতা ও প্রচারণা বৃদ্ধি, অভিযোগ করার পদ্ধতি সহজ করা হবে। পাশাপশি প্রতিটি থানায় নারী সহিংসতা প্রতিরোধ সেল ও নারী পুলিশ নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে।

নারীশিক্ষা বিষয়ে বিএনপির ইশতাহারে বলা হয়েছে, তারা স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ প্রদান করবে। জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তারা জীবনব্যাপী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সুযোগ চালু করে নারীদের কর্মজীবনে ফিরে আসার পথ তৈরি করবে। এছাড়া নারীর স্বাস্থ্য ও খেলাধুলা, মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও ক্যান্সার সচেতনতায় প্রতিটি জেলায় নারী স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলবে। আর এনসিপির ইশতাহারে বলা হয়েছে, তারা পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের নারীদের উচ্চশিক্ষা বৃত্তি চালু করবে। এর অধীনে প্রতি শিক্ষার্থীকে মাসিক ৫ হাজার টাকা বৃত্তি প্রদান করার পরিকল্পনা আছে দলটির। স্নাতক পর্যায়ে প্রতি বছর রিভিউর মাধ্যমে চার বছর পর্যন্ত এ সহায়তা চলবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ইশতাহারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তারা অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত নারী উন্নয়নবিষয়ক সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তা পর্যালোচনার জন্য একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করবে। বিএনপি এবং এনসিপি এ বিষয়ে এ বিষয়ে ইশতাহারে সরাসরি উল্লেখ না করলেও দল দুটি ইশতাহারে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, মাতৃত্বাকলীন ছুটি এবং কর্মস্থলে ‘ডে কেয়ার’ ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের বিষয়ে উল্লেখ করেছে। বিএনপি বলেছে, তারা নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে আর এনসিপি ইশতাহারে উল্লেখ করেছে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।

মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ডে কেয়ার সেন্টারের বিষয়ে বিএনপি বলেছে, তারা প্রজনন ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বৃদ্ধি করবে এবং কর্মস্থলে ‘ডে কেয়ার’ ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপন করবে। আর এনসিপি উল্লেখ করেছে, তারা সব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ বেতনে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও এক মাসের পিতৃত্বকালীন ছুটি ও সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ডে কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করবে। এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডে কেয়ার সুবিধায় প্রণোদনা দেয়া হবে। পাশাপাশি দলটি পিরিয়ড লিভ চালু করার কথাও উল্লেখ করেছে। এছাড়া জামায়াতও সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে ডে কেয়ার সেন্টার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়ানো হবে বলে উল্লেখ করেছে।

নারীকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি তাদের ইশতাহারে সরকারি সহযোগিতা প্রদানের কথা বলেছে। বিএনপি বলেছে, তারা নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা সহায়তা প্রদান এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাতে নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে। আর জামায়াতে ইসলামী বলেছে, তারা আমার আয়ের সংসার প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেবে। এর জন্য হাঁস-মুরগির খামার, গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ ইত্যাদি প্রকল্প তৈরিতে সরকারি সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া অভাবগ্রস্ত, সুবিধাবঞ্চিত অথবা ও বিধবা নারীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্পের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এককালীন পুঁজি সরবরাহ করা ও তদারক করা হবে।

দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও নারীর সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দিয়েছে। জামায়াত বলেছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তির মামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের দ্রুত বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। নারীর সম্পদের অধিকার নিশ্চিতে ধর্মীয় প্রচারণা বাড়ানো হবে। আর এনসিপি বলেছে, উত্তরাধিকার সম্পত্তির বণ্টনে পিতা-মাতার ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সুরক্ষা এবং সন্তানের সেই অনুসারে প্রাপ্য অধিকার দ্রুত বুঝে পেতে আইনি সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টি তাদের ইশতাহারে আরো যা যা উল্লেখ করেছে তার মধ্যে রয়েছে কাবিননামায় উল্লেখ করা অর্থ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে যাওয়ার বিধান, উপজেলা পর্যায়ে কম খরচে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে বিতরণ এবং এ সেবা নারীর জন্য সহজলভ্য করা এবং প্রচারণা চালানো, বাল্য বিবাহ রোধে ব্যাপক জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া হবে, প্রান্তিক অঞ্চলে স্যানিটারি স্বাস্থ্যসামগ্রী সরাসরি বরাদ্দ এবং নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতে নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত ও এলাকাভিত্তিক শাটল বাস সার্ভিস চালু করা।

অন্যান্য প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিএনপি বলেছে, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হবে পরিবারের একজন নারীকে। এছাড়া নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের উদ্যোগ নেয়া এবং স্বাস্থ্য ও হাইজিনের জন্য ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন করার কথাও বলেছে দলটি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, পিক আওয়ারে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস ও দোতলায় নিরাপদ কম্পার্টমেন্ট তৈরি করা হবে এবং অ্যাপে রিয়েল-টাইম বাস ট্র্যাকিং ও নিরাপদ যাত্রা তথ্য প্রদান করা হবে, নামাজের স্থান, টয়লেট ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা হবে ও অ্যাপের মাধ্যমে এ জায়গাগুলোর লোকেশন ট্র্যাক করা যাবে, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, নারীবান্ধব নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার এবং নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট ও নামাজের ব্যবস্থা করা হবে। দরিদ্র গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী এবং শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির জন্য সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা হবে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ইশতাহার ঘোষণা অনুষ্ঠানসহ একাধিক অনুষ্ঠানে নারীদের কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জামায়াতের আমির জানিয়েছেন, নারী যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, ওই প্রতিষ্ঠানে ৫ ঘণ্টার আর বাকি ৩ ঘণ্টার বেতন সরকার বহন করবে।

ইশতাহারের পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায়ও নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছে দলগুলো। বরিশালে ৪ ফেব্রুয়ারির জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—নারীর সম্মান, স্বাধীনতা এবং রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় ভূমিকা। তিনি বলেন, ‘দেশের লাখ লাখ নারী পোশাক শিল্পে কাজ করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু নারী সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি বাইরে কাজ করছেন। অথচ সেই নারীরাই আজ অসম্মান ও কটূক্তির শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এ নারীদের অবমাননা করলে জাতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষের অর্ধেকই নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি গৃহিণীর কাছে “ফ্যামিলি কার্ড” পৌঁছে দেয়া হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধাপে ধাপে স্বাবলম্বী করে তোলাই হবে দলের লক্ষ্য, যাতে তারা কারো ওপর নির্ভরশীল না থাকেন।’

অন্যদিকে পিরোজপুরে ৬ ফেব্রুয়ারির জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মায়েদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। মায়ের অপমান এ জাতি সহ্য করবে না। ঘর থেকে শুরু করে কর্মস্থল—সব জায়গায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে নারীদের মানবাধিকারের বিষয়টি হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও নারী অধিকার কর্মী রাশেদা কে চৌধুরীর। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক প্রতিশ্রুতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তাদের জন্য শুধু স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদি সেবা নিশ্চিত করলেই হবে না। নারীদের নীতিনির্ধারণী জায়গায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি কিন্তু নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার সময় প্রতিফলিত হয়নি। বিএনপি ৪ শতাংশের ওপরে দিয়েছে। বাম দলগুলো দিয়েছে। জামায়াত তো কিছুই দেয়নি। তারা আগামীর কথা বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘নারীদের ওপর ভর করে দেশের অনেক কিছুই চলে। নারীর শ্রমে অর্থনীতি চলছে। রফতানিমুখী পণ্য থেকে মাঠে-ময়দানে কৃষিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ঋণ সবকিছুতেই নারীরা ভূমিকা পালন করছে। অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্নই নেই। কিন্তু অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে কেন প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হচ্ছে। এটা আমাদের হতাশার জায়গা। আরেকটি বিষয় হলো, প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় তো রাখার জন্য। কিন্তু আগামীতে কোন দল কতখানি প্রতিশ্রুতি রাখবে সেটা দেখার অপেক্ষায়।’

গত বছর ১৯ এপ্রিল নারী অধিকার রক্ষায় বিশদ সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন। ওই প্রতিবেদনে অভিন্ন পারিবারিক আইনের মাধ্যমে সব ধর্মের নারীদের জন্য বিয়ে, তালাক, উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণে সমান অধিকার নিশ্চিত করা, সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে সংসদীয় আসন বাড়িয়ে ৬০০ করে সেই আসন থেকে ৩০০ আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত রেখে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, যেকোনো উপস্থাপনায় অহেতুক নারীর প্রসঙ্গ টেনে নারীবিদ্বেষী বয়ান, বক্তব্য ও ছবি পরিবেশন থেকে বিরত থাকা, নারীর প্রতি সম্মানজনক, মর্যাদাপূর্ণ ও যথাযথ সংবেদনশীল আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির লক্ষ্যে সামাজিক সচেতনতাবিষয়ক কর্মসূচি গ্রহণ, একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো সব প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছয় মাস ছুটি দেয়া এবং পূর্ণ বেতনসহ পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, গণমাধ্যমে ৫০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতসহ ৪৩৩টি সুপারিশ রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে এ প্রতিবেদন নিয়ে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রতিবাদ জানায় এবং শেষ পর্যন্ত এ প্রতিবেদন ঐকমত্য কমিশনে উপস্থাপন হয়নি।

তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো ভোটে জেতার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু পরে সেগুলো আর বাস্তবায়ন করে না। তাই শুধু ভালো প্রতিশ্রুতি মানেই যে নারীর অধিকার নিশ্চিত হবে তা নয়। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা একটি বড় বিষয়। এজন্য আমি মনে করি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।’

তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা সমাজে এখনো নারী একজন মানুষ হিসেবে যথাযথ সম্মান, শ্রদ্ধা, অধিকার পায় না। নির্বাচনের পরে কী হবে সেটা তো আরো পরের বিষয়। নির্বাচনের আগেই তো আমরা দেখছি দলগুলো নারী প্রার্থীদের, নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। সাইবার বুলিং একটা ব্যাধির মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থার যে পরে উন্নতি হবে সে নিশ্চয়তা তো নেই। এ অবস্থার উন্নতি শুধু তখনই সম্ভব যখন সামাজিকভাবে নারীর সম্মান নিশ্চিত হবে। এর জন্য নারী-পুরুষ আলাদা নয়, বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের অধিকার নিশ্চিতে দলগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারো জন্য আলাদা কর্মঘণ্টা বা প্রেসক্রিপশন নয়, বরং সবাই যাতে একই সুযোগ পায়, নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি সহায়তা পায় সে উদ্যোগ নিতে হবে।’

আরও