এর মাধ্যমে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লকে বিদেশী তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হলো। সচিবালয়ে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’-এর ঘোষণা দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
এবারের দরপত্রে বিদেশী কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে বেশকিছু নতুন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে নমনীয়তা, পাইপলাইন নির্মাণে ট্যারিফ সুবিধা, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে অংশীদারত্ব কমানো এবং গ্যাস রফতানির সুযোগ। সরকারের আশা, এসব সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এবার বড় ধরনের সাড়া পাওয়া যাবে।
আনুষ্ঠানিক এ ঘোষণার পর আগামী ১ জুন থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে পারবে। একই সঙ্গে সমুদ্রে পরিচালিত জরিপের তথ্যও কেনার সুযোগ থাকবে। দরপত্র কেনা ও জমা দেয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। এরই মধ্যে ৫৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণার আনুষ্ঠানিক এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম; যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন-১) মোর্শেদা ফেরদৌস; পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান; পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা অনেক দিনের একটা জট খুলে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করছি। আমাদের দেশের যে সম্পদ তা মাটির নিচে রেখে আমদানিভিত্তিক জ্বালানির দিকে ঝুঁকেছিলাম। এর ফলে দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক কমে গেছে। ১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া যে বিডিং করে গিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে যাদেরকে অ্যাওয়ার্ড করা হয়েছিল, তাদের একটি কোম্পানি শেভরন। এরপর আর বিদেশী কোম্পানিকে এনে দেশে বিনিয়োগ করা হয়নি।’
সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর অতীতে অনেক আলোচনা হলেও সমুদ্রের তলদেশে থাকা সম্পদ আহরণের বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি সমুদ্র বিজয় হয়েছে। তা নিয়ে অনেক লাফালাফি হয়েছে। সমুদ্রের নিচে কী রয়েছে সেটা নিয়েও অনেক কিছু বলা হয়েছে, কিন্তু সেখান থেকে যে আহরণ করতে হবে সেটা বোধহয় তারা ভুলে গিয়েছিল।’ প্রতিবেশী দেশগুলো এরই মধ্যে নিজেদের সমুদ্র এলাকায় গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলন শুরু করেছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, ১৮০ দিনের মধ্যেই অফশোর বিডিং রাউন্ড আহ্বান করেছে। দেশের আইন-কানুন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে ব্লক হস্তান্তর করা হবে। ভবিষ্যতে সমুদ্র থেকে তেল বা গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হলে তা দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখবে। জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকেই সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে দেশের কোনো ধরনের ক্ষতি না হয় এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস না করেই আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তেল-গ্যাস উত্তোলনের চুক্তি সম্পন্ন করা যায়।
এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী জানান, পুরো দরপত্র প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে এবং দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না করেই সব সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এরই মধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাই এবারের অফশোর বিডিং রাউন্ড অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা।
নতুন উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) অনুযায়ী, সমুদ্র থেকে গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের মজুদ, সরবরাহ ও পরিচালনা ব্যয়ের বিপরীতে নির্ধারিত ট্যারিফ পাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। আগের পিএসসিতে এ ধরনের সুবিধা ছিল না।
এবারের চুক্তিতে বহুজাতিক ঠিকাদারি কোম্পানি ও পেট্রোবাংলার মধ্যে মুনাফা ভাগাভাগির সূত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত ফল না এলেও কোনো ঠিকাদার যদি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আগ্রহী হয়, তাহলে তাদের মুনাফার অংশ ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এর আগে শ্রম আইন সংশোধন করে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশী কোম্পানিকে একটি সুবিধা দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে কোম্পানির মুনাফার অংশ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে দেড় শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।
পাশাপাশি অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানি করা যন্ত্রপাতির ওপর কর ও শুল্ক অব্যাহতি দেয়া হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আয়করও পরিশোধ করবে পেট্রোবাংলা। চুক্তি অনুযায়ী, পেট্রোবাংলা গ্যাস কিনতে না চাইলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দেশের অভ্যন্তরে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে পারবে। দেশে চাহিদা না থাকলে রফতানির সুযোগও থাকবে। এছাড়া দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর অগভীর সমুদ্রে ১০ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স)।
বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন পিএসসিতে গ্যাসের মূল্য কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত জ্বালানি তেল) মূল্যের ১১ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে সাড়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বা কমলে আনুপাতিক হারে গ্যাসের দামও পরিবর্তিত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলার হলে গভীর সমুদ্রের গ্যাসের মূল্য হবে ১১ ডলার। তবে গ্যাসের মূল্য অতিরিক্ত ওঠানামা ঠেকাতে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য ব্রেন্ট তেলের দামের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা নির্ধারণ করা হবে।
এর আগে পিএসসি-২০১৯ অনুযায়ী, গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম প্রতি হাজার ঘনফুটে নির্ধারণ করা হয়েছিল সোয়া ৭ ডলার এবং অগভীর সমুদ্রের জন্য সাড়ে ৫ ডলার। ২০২৩ সালের পিএসসিতে নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ না করে গভীর ও অগভীর—উভয় ক্ষেত্রেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের ১০ শতাংশ হারে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণার আয়োজনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘দেশের জ্বালানি খাতের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের একটি দিন। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্র এলাকায় পড়ে থাকা গ্যাস ব্লকগুলোয় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে সরকার অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করেছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি ছিল। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই দেশের সমুদ্র ও স্থলভাগে সম্ভাবনাময় জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে সরকারের মেয়াদ শেষে এ খাতে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।’
অতীতের দরপত্র নথিতে যেসব সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি ছিল, সেগুলো সংশোধন করে এবার নতুনভাবে কাজ করা হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সফল বিডিং রাউন্ড শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়। তারই সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি সফল বিডিং রাউন্ড হবে বলে আমরা আশা করছি। অতীতে টেন্ডার ডকুমেন্টে যেসব ব্যর্থতা-ত্রুটি ছিল, সেগুলো সংশোধন করে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি। দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করেই এ বিডিং রাউন্ড সম্পন্ন করা হচ্ছে। তার জন্য গণমাধ্যমের সহায়তা প্রয়োজন।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সর্বশেষ ২০২৪ সালে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সাতটি বিদেশী কোম্পানি তথ্য-উপাত্ত কিনলেও ওই দরপত্রের সময়সীমার মধ্যে কেউ আর আগ্রহ দেখায়নি। কেন ওই সময় কোম্পানিগুলো দরপত্রে অংশ নেয়নি তার কারণ ও মতামত জেনে এবারের পিএসসি সংশোধন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালে আমরা যখন বিডিং রাউন্ড করেছিলাম। তখন কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। আমরা সে সময় একটা কমিটি গঠন করি। ওই কমিটির মাধ্যমে আইওসিদের (তেল-গ্যাস কোম্পানি) সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা গ্যাসের প্রাইজের বিষয়টি নিয়ে অনাগ্রহের কথা বলে। তারা বলেছিল, গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য হয়নি। এছাড়া পাইপলাইনের ট্যারিফের বিষয়টিও উঠে আসে। অর্থাৎ গভীর সাগরে যদি গ্যাস পাওয়া যায়, তা আনতে পাইপলাইন নির্মাণে যে ট্যারিফ, সে বিষয়টাও তারা জানিয়েছিল। এছাড়া ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ), যেখানে বিদেশী কোম্পানির মুনাফার ৫ শতাংশ, সেটিও তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এ হার কমিয়ে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তথ্য-উপাত্তের ঘাটতির বিষয়টিও উল্লেখ করে আইওসিগুলো। তাদের মতে, বিড ডকুমেন্টে পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক ও অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্য না থাকায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইন ট্যারিফ, ডব্লিউপিপিএফ কাঠামো এবং তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি—এ চারটি বিষয় নিয়ে সরকার এক বছর ধরে কাজ করেছে। এ তথ্য জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বলেন, ‘এক্সন মবিলের মতো কোম্পানির কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া হয়েছে। বিদেশী বিশেষজ্ঞদেরও নিয়োগ করা হয়। এছাড়া দেশীয় যারা এক্সপার্ট রয়েছেন, তারাও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। ফলে ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ড যেটা তৈরি করা হয়েছে, সেখানে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।’
২০১২ সালে ভারত ও ২০১৪ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এর ফলে সমুদ্রে বিরাট এলাকা নিয়ে তৈরি হয় নতুন সম্ভাবনা। গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীরে ১১টি মিলিয়ে মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়। যদিও এর আগেই শুরু হয়ে যায় সমুদ্রে তেল-গ্যাসের অনুসন্ধান। এ পর্যন্ত মোট চারটি কোম্পানি বিভিন্ন সময় অনুসন্ধান শুরু করলেও কাজ শেষ না করেই চলে গেছে। এখন সমুদ্রে কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে না। তাই ২৬টি ব্লকেই দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে।