মাইলস্টোন ট্রাজেডির এক বছর আজ

এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ ট্রাজেডির ক্ষত এখনো বহন করছেন নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। সেই দিনের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর আর্তনাদ ও আহতদের জীবন বাঁচাতে নিরলস ছুটে চলা উদ্ধারকর্মীদের দৃশ্য এখনো অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। গত বছরের এ দিনে সংঘটিত দুর্ঘটনায় বিমানটির পাইলটসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান। এদের মধ্যে— ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক, একজন কর্মচারী ও বিমানটির পাইলট ছিলেন।

গত বছরের ২১ জুলাই দুপুর ১টার দিকে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম নিহত হন।

দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিমান বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের স্বেচ্ছাসেবকরাও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। তারা আহত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্ধার করে দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে এবং জরুরি ভিত্তিতে রক্ত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করে। এ সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, চিকিৎসক ও নার্সরা সমন্বিতভাবে আহতদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করেন।

গুরুতর দগ্ধ ও আহতদের অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সে সময় তাদের অবস্থা অনুযায়ী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হয়।

এ ঘটনায় তৎকালীন অন্তবর্তী সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত বছরের ৫ নভেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়া হয়। পরে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুর্ঘটনায় মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এ সময় তিনি আরো বলেন, তদন্তে উঠে এসেছে, স্কুল ভবনটি রাজউকের অনুমোদিত জাতীয় বিল্ডিং কোডের (বিএনবিসি) আওতায় নির্মিত হয়নি। ভবনে মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল, যেখানে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকা উচিৎ ছিল। পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকলে হতাহতের সংখ্যা অনেক কম হতে পারত।

ভবিষ্যতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে, বিমান বাহিনীর ইনিশিয়াল ট্রেনিং রাজধানীর বাইরে সরিয়ে নিতে সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ ট্রাজেডির ক্ষত এখনো বহন করছেন নিহতদের স্বজন, সহপাঠী, শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। সেই দিনের বিভীষিকা, স্বজন হারানোর আর্তনাদ ও আহতদের জীবন বাঁচাতে নিরলস ছুটে চলা উদ্ধারকর্মীদের দৃশ্য এখনো অনেকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে।

আজও দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন। যে সব পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের কাছে ২১ জুলাই কেবল একটি তারিখ নয়- এটি চিরস্থায়ী বেদনা, অপূরণীয় শোক ও অমলিন স্মৃতির দিন।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রাজেডির এক বছর পূর্তিতে আজ নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাঁদের স্মরণ করেন।

বিকেলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অংশগ্রহণে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

আরও