এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিলের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ও শরিয়াহভিত্তিক সুকুকও রয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়া এসব ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি সরকারকে নতুন ঋণও নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের এত বেশি ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতকে আরো বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হতে যাওয়া বিল-বন্ডের দায় পরিশোধের আর্থিক সামর্থ্য সরকারের নেই। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ঋণ নিয়েই তা পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ঋণ চক্রে জড়িয়ে পড়া সরকারের দায় আরো বাড়বে। ‘ঋণ চক্র’ হলো এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে পুরনো দায় শোধ করার জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হয় এবং ঋণের স্থিতি না কমে দিন দিন বাড়তে থাকে।
সরকারের সিকিউরিটিজের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতি ত্রৈমাসিকে ‘কোয়ার্টারলি বুলেটিন অব বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রকাশনাটির এপ্রিল-জুন সংখ্যা প্রকাশিত হয় গত সপ্তাহে। এতে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকার সরকারি সিকিউরিটিজের মেয়াদ পূর্ণ হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ট্রেজারি বিল, যার পরিমাণ ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩২৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি ৭১ হাজার ৯৬০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার ট্রেজারি বন্ড মেয়াদপূর্তির তালিকায় রয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক ও ১ হাজার ৯৯২ কোটি ৫৪ লাখ টাকার শর্ট টার্ম বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট সিকিউরিটিজের (এসপিটিবি) মেয়াদ পূর্ণ হবে। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে এমন ট্রেজারি বিল-বন্ড ও সুকুকের পরিমাণ ৭১ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। তিন মাস আগে গত মার্চেও এ স্থিতির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত অর্থবছরের শেষ তিন মাসে (মার্চ-জুন) সরকারি সিকিউরিটিজের স্থিতি ৬০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেড়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে নেয়া সরকারের এ ঋণের ২২ শতাংশ ট্রেজারি বিলের।
বর্তমানে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিল প্রচলন রয়েছে। আর দুই থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের বিপরীতে ঋণ স্থিতি রয়েছে ৬৭ শতাংশ। বাকি ১১ শতাংশ সুকুক ও বিশেষ বন্ডের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে সরকার।
ঋণ নিয়ে ঋণ শোধের বিদ্যমান পরিস্থিতিকে সরকারের জন্য ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না। এ কারণে বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় ঋণ নিতে হচ্ছে। সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদহার অনেক বেশি। যেসব ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ চলতি অর্থবছরে শেষ হবে, সরকার সেগুলো “রোলওভার” করতে বাধ্য হবে। কারণ এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এ মুহূর্তে সরকারের নেই।’
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেয়া উচ্চ সুদের ঋণ সরকারের জন্য ‘বিষফোড়া’ হয়ে দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘সরকার চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত পরিমাণ রাজস্ব আয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানির যে সংকট চলছে, তার প্রভাবে বেসরকারি খাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিস্থিতি আরো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। চলতি বাজেটে সরকার ঋণের সুদ খাতে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরেছে। এ সুদের ৭৫ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে চলে যাবে। একদিকে রাজস্ব ঘাটতি, অন্যদিকে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সরকারের জন্য বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। রেকর্ড এ বাজেট বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ। ট্রেজারি বিল-বন্ড তথা সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে এ ঋণ নেয়া হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে সরকারকে ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশি পরিমাণ ঋণ নিতে হতে পারে। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংশোধিত বাজেটে এ লক্ষ্য বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটের চেয়েও ব্যাংক থেকে সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে কেবল ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। একই সময়ে পরিশোধ করেছে সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ। সে হিসাবে গত জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণ ছিল ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের কোন সময়ে কী পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হবে, সেটি বিবেচনা করেই বাজেটে নিট ঘাটতি অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়। প্রাক্কলনের তুলনায় সরকারের বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে সেটি সংশোধিত বাজেটে সমন্বয় করা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া বিল-বন্ডের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এরই মধ্যে বাজার থেকে ঋণ উত্তোলন শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসায় দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য জমা হয়েছে। এ কারণে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায় আগস্টেও রেকর্ড পরিমাণ ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলাম হয়েছে। এতে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া ঋণের মেয়াদ নতুন করে বাড়ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। আমরা কেবল সে দায়িত্ব পালন করছি। এ ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, সেটি সরকারকেই ভাবতে হবে।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না। তাই ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আবার ঋণনির্ভরতা সত্ত্বেও বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ কমার কথা নয়। বরং সময়ের সঙ্গে তা আরো বাড়বে, এটিই স্বাভাবিক।’
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে সরকার ঋণনির্ভর হয়ে পড়ে। ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকে আওয়ামী সরকার ঋণ করেছে প্রায় ১৬ লাখ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারের এ ঋণ স্থিতি প্রায় ১৯ লাখ কোটি টাকায় ঠেকে। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে পাঁচ মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। ফলে বেড়েছে দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, কেবল জুনে দেশে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৭১ শতাংশের বেশি। ওই মাসে দেশের আমদানি ব্যয় ঠেকে ৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ৭৫১ কোটি ডলারে, যেখানে ২০২৪ সালের জুনে ছিল ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় সরকারের ঋণনির্ভরতা আরো বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে রাজস্ব আয়ও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পিছিয়ে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা। জুনের পর নতুন তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বেতন বাড়ালে সরকারের ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাড়বে। এতে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরো বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতে বিরাজমান ঋণ খরা বর্তমানে আরো তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। তবে এসব প্যাকেজের বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।
অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে তিন বছরের মধ্য অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতিতে এ বিষয়ে বলা হয়, আগামী তিন বছরে সরকারের ঋণ স্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে বলে প্রক্কলন করেছে অর্থ বিভাগ। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এর পরবর্তী অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে এবং তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে এ ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। এ বিশাল ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান থাকবে ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।