কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের দাবি খানির

আলোচনায় বক্তারা কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, অন্যান্য খাতে (যেমন তামাক, বিদ্যুৎ, ওষুধ) মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কৃষি খাতে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ও দেশের কৃষি খাত বাঁচাতে অবিলম্বে একটি কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের জোর দাবি জানিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক- খানি বাংলাদেশ। আজ বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে খানি এবং পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক- প্রান আয়োজিত ‘কৃষকদের সুরক্ষা: কেন একটি কৃষি মূল্য কমিশন প্রয়োজন’ শীর্ষক মিডিয়া ক্যাফেতে এ দাবি উত্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ও বিশেষ অতিথি ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমান। এ সময় খানি নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য উপস্থাপন করে। এতে প্রান্তিক কৃষকের বাস্তব পরিস্থিতি এবং নীতি ও বাস্তবায়নের ভারসাম্যহীনতা উঠে আসে।

আলোচনায় বক্তারা কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর কৃষি মূল্য কমিশন গঠনের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, অন্যান্য খাতে (যেমন তামাক, বিদ্যুৎ, ওষুধ) মূল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলেও দেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী কৃষি খাতে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারের অস্বাভাবিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা কৃষকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে মেহেরপুরের পেঁয়াজ চাষী সাইফুল শেখ এবং রাজশাহীর মীর রুহুল আমিনসহ একাধিক কৃষকের আত্মহত্যা এ সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

প্রধান অতিথি ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তথ্য ও পরিসংখ্যান। এ খাতে ডেটা ম্যানিপুলেশন অনেক বছরের সংস্কৃতি। সঠিক পরিসংখ্যান এক্ষেত্রে কৃষকদের উপকৃত করতে পারে। তিনি বলেন, কৃষকদের নিয়ে কাজ করার সুবাদে আমরা একটি কৃষকবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। আমাদের কৃষিতে ৬টি হটস্পট চিহ্নিত করে ৯টি থিম্যাটিক এরিয়া তৈরি করেছি পেশাগত উন্নয়নের জন্য। এই ভিত্তির ওপর নির্ভর করে আমরা ২৫ বছরের একটি কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি।

কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, আমরা এই কমিশনের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চাই। ভারতের ২৩টি পণ্যে ন্যূনতম সমর্থন মূল্যের (এমএসপি) বিষয়টি বিবেচনায় আছে, তবে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন নিয়ে ভাবতে হবে। সরকার এরই মধ্যে এ নিয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা শুরু করেছে। তিনি জানান, কৃষকের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করা হয় এবং এবার ধান-চালের মূল্য নির্ধারণে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা কৃষকের ঋণমুক্তি, শস্য বীমা চালু, কৃষিপণ্য সংরক্ষণে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন যে, কৃষি মূল্য কমিশন গঠন শুধু কৃষকের আত্মহত্যাই ঠেকাবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়ক হবে।

প্রাইস কমিশন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, প্রাইস কমিশন নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কৃষকরা এসব প্রতিষ্ঠানে কতটা প্রতিনিধিত্ব পায়। তিনি বলেন, পুরো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে আমাদের উৎপাদন পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ভৌগোলিক অঞ্চলের ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে কার্যক্রম সাজানো উচিত। তিনি মন্তব্য করেন, আমরা প্রায়শই বৃহৎ আকারের স্টোরেজের কথা ভাবি, অথচ যুবকদের উদ্ভাবনী চিন্তাগুলো কাজে লাগিয়ে চরের মতো অঞ্চলেও স্টোরেজ তৈরি সম্ভব। তিনি ইউনিয়ন পর্যায় থেকে চিন্তা শুরু করার গুরুত্বারোপ করেন।

এছাড়াও উক্ত মিডিয়া ক্যাফেতে সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ (কৃষি) ড. মিহির কুমার রায় ও ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, খানির সহ-সভাপতি রেজাউল করিম সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক শরমিন্দ নীলর্মী এবং খানির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও