এবারও আসছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি

মে শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে ৭.১৭ শতাংশে

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরেই সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য অর্জনে লাগাম টানা হয়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে, বাড়ানো হয়েছে ঋণের সুদহার।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক বছর ধরেই সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য অর্জনে লাগাম টানা হয়েছে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে, বাড়ানো হয়েছে ঋণের সুদহার। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির এ ধারাবাহিকতা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও অব্যাহত থাকছে। গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ৩১ জুলাই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় এক অংকের এ লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ২০২৪ সালের মে থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। নিকট অতীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এতটা ভাটা দেখা যায়নি।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ সুদহার। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ। যদিও তিন বছর আগে এ রেট ৫ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। দুই অংকের রেপো রেটের প্রভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার এখন ১৫-১৬ শতাংশে ঠেকেছে। এত উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাইছেন না। এ কারণে বেসরকারি খাতে স্থবিরতা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। মুদ্রানীতির খসড়া ৩০ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদনের পর ৩১ জুলাই গভর্নর মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি। মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার ১০ শতাংশে থাকবে। সে হিসাবে আগামী ছয় মাস তথা চলতি বছর নীতি সুদহার কমানোর সম্ভাবনা নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তিন বছর ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকা মূল্যস্ফীতি এখন কমতে শুরু করেছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমুখী মুদ্রানীতিরই ফল। মূল্যস্ফীতি যাতে আরো কমে আসে, সেজন্য মুদ্রানীতির ভঙ্গি অপরিবর্তিত থাকবে। এক্ষেত্রে খুব বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দেয়া তথ্যে দেখা যায়, টানা চার মাস ধরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি কমেছে। সর্বশেষ জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঘোষিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনে সহায়তার জন্যই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। যদিও বেশ কয়েক বছর ধরেই মুদ্রানীতিতে ঘোষিত লক্ষ্য অধরা থেকেছে।

বেসরকারি খাতকে প্রাণবন্ত করতে নীতি সুদহারের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদহার দ্রুত কমিয়ে আনার দাবি জনিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। এর আগে একাধিকবার তারা অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ দাবি জানান। যদিও সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের এ দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি। বরং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানোর সম্ভাবনা নেই বলে জানানো হয়েছে।

নতুন মুদ্রানীতিতে প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে গভর্নর মহোদয় ইতোপূর্বে মতামত জানিয়েছেন। সে হিসেবে আমরা ধরে নিচ্ছি, নতুন মুদ্রানীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। সংকোচনমুখী ধারা অব্যাহত রেখেই মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি রেপো বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি হলে মুদ্রাবাজারে তারল্য সংকট বেড়ে যেতে পারে। কারণ আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে রেপো কিংবা কলমানিতে লেনদেনের মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই।’

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়বে না বলে মনে করেন সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে এ মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। এ পরিস্থিতিতে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখেন। দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি পরিস্থিতিও ভালো নেই। শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনো সমঝোতা হয়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি না বাড়াই স্বাভাবিক। মুদ্রানীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ালেই ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারবে না। বরং সামগ্রিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ এমনিতেই বাড়বে।’

আরও