কাঁচামাল থাকলেও রংপুরে থমকে আছে বায়োগ্যাসের সম্ভাবনা

রংপুরে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও বায়োগ্যাস প্লান্টের ব্যাপক সম্ভাবনা থমকে আছে। পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার অভাবে এ খাতের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

তবে কিছু উদ্যোক্তা নিজস্ব উদ্যোগে বর্জ্য থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন। এককালীন বড় অংকের খরচের কারণে অনেক খামারি পিছিয়ে পড়ছেন। তাদের দাবি, সমন্বিত উদ্যোগ ও সরকারি সহায়তা পেলে এ অঞ্চল জ্বালানি সংকটে নতুন পথ দেখাতে পারে।

রংপুর শহর ও বিভিন্ন উপজেলার খামারিরা বায়োগ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি ও বাড়তি আয়ের পথ দেখাচ্ছেন। রংপুর সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের তাঁতিপাড়া এলাকার আশফাকুর রহমান নিপু প্রায় ১০ বছর আগে ২১ শতক জমিতে গরুর খামার গড়ে তোলেন। সাড়ে ৩ লাখ টাকা খরচে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন।

বর্তমানে এ প্লান্ট থেকে দুটি খামারের গোখাদ্য সেদ্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি ১৬টি বাড়িতে গ্যাসের সংযোগ দিয়েছেন। প্রতি বাড়ি থেকে মাসে ১ হাজার টাকা করে পান। গ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট তরল বর্জ্য (স্লারি) ডিওয়াটারিং মেশিনের মাধ্যমে শুকিয়ে তিনি জৈব সার তৈরি করছেন। মাসে ১৫০-২৫০ কেজি সার উৎপাদন হয়, যা প্রতি কেজি ৮ টাকা দরে বিক্রি হয়।

নগরীর জুম্মাপাড়া মারুয়া পট্টি এলাকায় মো. তারিকুল ইসলাম প্রায় নয় বছর আগে ২৫টি গরু নিয়ে বায়োগ্যাস প্লান্ট চালু করেন। তার প্রয়াত বাবা ইয়াসিন আলী ৪ লাখ টাকা খরচে প্লান্টটি স্থাপন করেছিলেন। ১৫ চুলা চলার কথা থাকলেও বর্তমানে আটটি চালু রয়েছে। প্রতিটি বাড়ি থেকে মাসে ১ হাজার টাকা সংযোগ ফি নেয়া হয়। আগামীতে গোবর থেকে জৈব সার উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন তিনি। তারিকুল বলেন, ‘বায়োগ্যাস খামারিদের জন্য উপকারী এবং পরিবেশ ভালো রাখে। তবে শুরুতে বড় অংকের বিনিয়োগের কারণে অনেকেই সাহস পান না।’

তারাগঞ্জ উপজেলার ইকোরচালি ইউনিয়নের হাজীপাড়া মেনা নগরের মো. মুসা এক বছর আগে এক হাজার লেয়ার মুরগির ফার্মে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন। ৮০ হাজার টাকা খরচে নির্মিত এ প্লান্টে তিনি ১০ হাজার টাকা সহায়তা পান। দৈনিক উৎপাদিত মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে প্লান্টটি সচল রাখা হয়। লোডশেডিং মোকাবেলায় তিনি উৎপাদিত গ্যাস জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করেন। এর মাধ্যমে টানা ৫ ঘণ্টা এবং বিরতি দিয়ে চালালে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পান।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা গোবর সরাসরি জমিতে দিলে গাছের শেকড় পুড়ে যায় ও ক্ষতিকারক বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হয়। এতে ফলনের মারাত্মক ক্ষতি হয়। কিন্তু বায়োগ্যাস প্লান্টের প্রক্রিয়াজাত ‘স্লারি’ জমিতে ব্যবহার করলে কোনো দূষণ হয় না, বরং জমির উর্বরতা ও ফলন বহুগুণ বাড়ে।

বায়োগ্যাস প্লান্ট বিশেষজ্ঞ মো. আবু মুসা মুকুল জানান, রংপুরে কাঁচামালের ব্যাপক সরবরাহ থাকায় বায়োগ্যাসের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তিন-চারটি গরু থাকলেই ২-৩ ঘনমিটার বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব, যা দিয়ে পাঁচ- ছয়জনের পরিবারের রান্না চলে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অন্তত ৩০ ঘনমিটার বায়োগ্যাস প্রয়োজন। এজন্য ৬০টি গরু বা চার হাজার মুরগি থাকতে হয়। প্লান্ট স্থাপনে এককালীন খরচের ভয় কাটাতে সরকারি সহায়তার দাবি জানান তিনি।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুরের আটটি উপজেলায় ১২৭ খামারি গরুর বর্জ্য দিয়ে গ্যাস উৎপাদন করছেন। জেলায় নিবন্ধিত গাভীর খামার ১ হাজার ৩২৮ ও অনিবন্ধিত ১ হাজার ৮২১টি। এছাড়া নিবন্ধিত লেয়ার মুরগির খামার ৩৮৮টি ও অনিবন্ধিত ১৯৯টি রয়েছে।

রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ নাজমুল হুদা জানান, জেলায় বায়োগ্যাসের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি জ্বালানির চাহিদা মিটবে এবং জৈব সার ফলন বাড়াবে। বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে আগ্রহীদের জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

আরও