চট্টগ্রামে টানা পাঁচ আমন মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহে ব্যর্থ খাদ্য অধিদপ্তর

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৌসুমের শুরুতেই আমন আবাদ ও উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৌসুমের শুরুতেই আমন আবাদ ও উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। শুধু এ মৌসুমেই চট্টগ্রামের প্রায় চার লাখ টন আমনের উৎপাদন কম হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামে মোট এক লাখ ২৩ হাজার ৫৫৫ টন ধান-চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা দেয় খাদ্য অধিদপ্তর। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ করা হয়েছে মাত্র ৬২ হাজার ৬৮৩ টন বা ৫০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। শুধু এ অর্থবছরেই নয়, পাঁচ অর্থবছর ধরেই ধান-চাল ক্রয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধানের আবাদ বা উৎপাদন রংপুর বা ময়মনসিংহ অঞ্চলের মতো নয়। তাছাড়া সরকারের কাছে ধান-চাল বিক্রিতে এ অঞ্চলের কৃষকদের সেভাবে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব হয়নি, তাই প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, আমন মৌসুমের ধান কাটা শুরু হলে ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধান ও সেদ্ধ চাল এবং চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আতপ চাল ক্রয়ের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। আমন ধান কেজিপ্রতি ৩৩ টাকা দরে ৩৮ হাজার ১৭০ টন, সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা দরে ৫৮ হাজার ৪১০ টন এবং আতপ চালের কেজিপ্রতি ৪৬ টাকা দরে ২৬ হাজার ৯৭৫ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। এ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ধান ক্রয় হয়েছে মাত্র দুই হাজার ৯৪১ টন বা ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। সেদ্ধ চাল ৩৯ হাজার ১৭১ টন এবং আতপ চাল ক্রয় করা হয়েছে ২০ হাজার ৫৭১ টন। অর্থাৎ এক লাখ ২৩ হাজার ৫৫৫ টনের বিপরীতে মোট ৬৩ হাজার টন ধান-চাল ক্রয় করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।

এদিকে বিগত বছরের ধান-চাল ক্রয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি মৌসুমের ধান-চাল ক্রয়ে খাদ্য অধিদপ্তর যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সেটা গত পাঁচ বছর ধরেই চলছে। অর্থাৎ চলতি মৌসুমসহ গত পাঁচ বছরে কোনোবারই সরকারের দেয়া ধান-চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৩৫৪ টন ধানের মধ্যে মাত্র ৯৬৪ টন, ৩৭ হাজার ৮৫০ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে দুই হাজার ১৯৬ টন এবং ১০ হাজার ৩৮৮ টন আতপ চালের বিপরীতে কেনা হয় মাত্র এক হাজার ১৮১ টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৬১৩ টনের ধানের মধ্যে ১২ হাজার ৭৪৯ টন, ৫৮ হাজার ১৮৪ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৫৬ হাজার ৬৮৫ টন কেনা হয়। এ বছর আতপ চাল কেনা বন্ধ ছিল।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৭২১ টনের ধানের মধ্যে মাত্র এক হাজার ৩৩৯ টন, ৪৩ হাজার ২৮৯ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৩১ হাজার ৯৬৬ টন সেদ্ধ চাল ক্রয় করা হয়। এ বছরে আতপ চাল কেনা বন্ধ ছিল। এদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৭ হাজার ৭৩৫ টন ধানের মধ্যে মাত্র দুই হাজার ৫৯০ টন, ৪৫ হাজার ৩৭৮ টন সেদ্ধ চালের বিপরীতে ৪৩ হাজার ৬০৬ টন এবং ৫৭ হাজার ২৮ টন আতপ চালের বিপরীতে কেনা হয় মাত্র ২৩ হাজার ৮৩৩ টন। অর্থাৎ ধান কেনার হার ২০২০-২১ থেকে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ, ২৯ দশমিক ৯১ শতাংশ, ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধান-চালের মান ভালো নয়। দেশের উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গে যেভাবে উৎপাদন হয় সেই তুলনায় এ অঞ্চলের চাল উৎপাদন এবং মান তুলনামূলক কম। তাছাড়া এ অঞ্চলে বর্ষা ও বন্যার কারণে আমন মৌসুমে আবাদ কম হওয়ার পাশাপাশি আমন কাটার সময়ে বন্যার কারণে এ অঞ্চলে উৎপাদনও কমেছে। শুধু চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আমনের উৎপাদন হয়েছে ১২ লাখ টন চালের। বছরের ব্যবধানে সাড়ে তিন-চার লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে এ মৌসুমেই। অন্যদিকে সরকারি ধান-চাল ক্রয়ে নানা জটিলতা থাকা, ধান-চাল ক্রয়ে মান নিয়ন্ত্রণ করা, সরকারি টাকা পেতে সময়ক্ষেপণের কারণে সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয়ে প্রতি বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া মিল মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করা হলেও তারা সেখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে জানান তারা।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের সহকারী উপপরিচালক মো. সহিদ উদ্দিন মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে গত ১৫ মার্চ আতপ চাল ক্রয়ের মাধ্যমের চলতি মৌসুমে আমন ধান-চাল ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে। সেদ্ধ ও আতপ চাল ক্রয় কিছুটা সন্তোষজনক হলেও ধান একেবারেই ক্রয় করা সম্ভব হয়নি। এ বছর আমনের উৎপাদন এ অঞ্চলে কমেছে। সরকারিতে কৃষকদের ধান-চাল বিক্রির আগ্রহ কম। আমরা মাঠ পর্যায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তবে মাঠ পর্যায় থেকে আমরা সেভাবে সাড়া পাইনি।’

কর্মকর্তারা আরো জানান, চাল কোনোভাবে কেনা সম্ভব হলেও ধান ক্রয় কোনোভাবেই অর্ধেকেও নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। ৩০-৪০ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত তিন বছরে আমন মৌসুমে তিন হাজার টন ধানও ক্রয় করা যায়নি। কৃষকদের কোনোভাবেই সরকারি খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে নিয়ে আসা যাচ্ছে না। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ ব্যবস্থা সহজতর করা, কৃষকদের জন্য দ্রুত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা, স্থানীয় মিল মালিকদের আরো কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা এবং আঞ্চলিক কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা প্রয়োজন। টানা পাঁচ বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারার এ ধারাবাহিকতা খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে উদ্বেগ তৈরি করছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নিলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ আরো সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও