পলি পড়ে ভরাট উৎসমুখ মৃতপ্রায় বগুড়ার করতোয়া

উজানে উৎসমুখ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বগুড়ার করতোয়া নদী এখন প্রায় মৃত। প্রবাহ না থাকায় অপরিচ্ছন্ন ও বড়সড় নর্দমার এ নদী এখন বহন করছে জীবাণু।

উজানে উৎসমুখ পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বগুড়ার করতোয়া নদী এখন প্রায় মৃত। প্রবাহ না থাকায় অপরিচ্ছন্ন ও বড়সড় নর্দমার এ নদী এখন বহন করছে জীবাণু। বগুড়া শহরের প্রায় ৩০ কিলোমিটারজুড়ে নদীটিতে কোনো পানি দেখা যায় না। কিছু জায়গায় যে পানি দেখা যায়, তা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার পানি।

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালী নদীর খুলশী এলাকায় এ নদীর উৎসমুখে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। পরে ধীরে ধীরে পলি পড়ে বগুড়ার দিকে প্রবাহিত করতোয়া নদী উঁচু হয়ে যায়। ফলে নদীর উৎসমুখে পানি প্রবেশ করতে পারছে না।

বগুড়ার ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ করতোয়া নদীর তীরঘেঁষে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর গোড়াপত্তন হয়। সে সভ্যতা দিনে দিনে যেমন বিলীন হয়েছে, করতোয়া নদীও তেমনি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এ নদী বগুড়া শহরের বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে জেলার শেরপুর উপজেলার চান্দাইকোনা এলাকায় বাঙালি নদীতে গিয়ে মিলেছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকা থেকে বগুড়া করতোয়া নদীর উৎপত্তিস্থল ধরা হলে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে দূষণ, দখল, ভরাট, পানিপ্রবাহ না থাকায় মরা নদী হিসেবে পরিণত হয়েছে অধিকাংশ। বগুড়া শহরের মধ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার নদী একেবারে বড় ড্রেনে পরিণত হয়েছে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে এতে কোনো পানিই নেই। স্থানে স্থানে জমির চর পড়ে আছে। কোথাও আবার পানিশূন্য। কোথাওবা ড্রেনের নোংরা কালো পানি বয়ে চলেছে।

স্থানীয়রা বলছে, নদীর কারণেই এখন শহরে দুর্গন্ধ ছড়ায়। মশা জন্মায়। ইচ্ছেমতো ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

নদীর ইতিহাসে আছে, ১৯৮৮ সালে করতোয়া নদীতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। সে বন্যায় বগুড়া শহরের বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যায়। এ শহরকে রক্ষা করতে নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে গাইবান্ধা জেলার নুরুল্লার বিল প্রকল্পের আওতায় গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চকরহিমপুর নামক স্থানে (লোয়ার) করতোয়ার উৎসমুখে জলকপাট নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণের মাধ্যমে করতোয়া নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। সে সময় ওই অংশে করতোয়ার মূল স্রোত একটি শাখা নদীর মাধ্যমে বাঙ্গালী নদীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এতে গোবিন্দগঞ্জ থেকে বগুড়ার দিকে করতোয়া নদীর প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে দিনে দিনে সরু খালে পরিণত হয়।

ইতিহাসখ্যাত করতোয়া নদীর উৎসমুখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জলকপাট নির্মাণের পর থেকে পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীমুখ ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে আছে। নদীটির শহরের ভেতরের অংশে যে যেখানে পেরেছে দখল করেছে। ভবনও নির্মাণ করেছেন অনেকে। একদিকে উজানে পানিশূন্যতায় প্রবাহ বন্ধ, অন্যদিকে ভরাট আর দখলের ফলে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। বর্ষাকাল ছাড়া পানি পাওয়া যায় না নদীতে।

পরিবেশবিদরা নদীটি পুনঃখনন করে কাটাখালী অংশে দুটি স্লুইসগেট নির্মাণ করার দাবি জানিয়েছেন। স্লুইসগেট থাকলে বর্ষাকালে এ নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। শুষ্ক মৌসুমে স্লুইসগেটটি খুলে দিলে নদীর পানি দিয়ে কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারবেন। একই সঙ্গে সারা বছর পানিপ্রবাহ থাকবে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, করতোয়া নদীর যৌবন ফেরাতে কাজ চলমান। প্রায় ৪৭ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে নদী পুনঃখনন ও ডান তীরে স্লোব প্রটেকশন প্রকল্পের কাজ চলছে। এতে শহর অংশে ১৭ কিলোমিটার খনন, এসপি ব্রিজ থেকে জেলা প্রশাসক কার্যালয় পর্যন্ত ৭৩৫ মিটার নদীতীর রক্ষাকাজের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা পাবে। এছাড়া নতুন করে ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বগুড়ার মাটিডালি থেকে নওদাপাড়া পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হচ্ছে।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক জানান, করতোয়া নদীর প্রাণ ফেরাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের আওতায় বগুড়া জেলার সদর উপজেলা ও শাহজাহানপুর উপজেলায় করতোয়া নদীর ২৮ কিলোমিটার, সদর উপজেলাধীন সুবিল ও অটো খালের ২৭ কিলোমিটার খনন এবং করতোয়া নদীতীরে ৭৩০ মিটার স্লোব প্রটেকশন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্তমানে করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কাজ এগিয়ে চলেছে। এখন উজানে ৫৭ কিলোমিটার ও ভাটিতে ২৩ কিলোমিটার খননকাজ বাকি রয়েছে। মোট ৮০ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হলে নদীটি তার অস্তিত্ব ফিরে পাবে। সারা বছর পানিপ্রবাহ থাকবে।

আরও