উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও পঞ্চগড় এলাকার মানুষের অত্যন্ত প্রিয় এবং ঐতিহ্যবাহী একটি খাবারের নাম ‘প্যালকা’। রাজবংশী সম্প্রদায় ও স্থানীয় আদি অধিবাসীদের হাত ধরেই এ খাবারের উৎপত্তি।
বিশেষ এ পদটি বিভিন্ন ধরণের শাকের সংমিশ্রণে তৈরি এক ধরণের স্যুপ বা ঝোল জাতীয় খাবার। তবে এর বিশেষত্ব হলো এটি রান্নায় তেল বা মশলা ব্যবহার করা হয় না।
উপকরণ:
- ৫-৭ পদের শাক (সজনে পাতা, পাট শাক, কলমি শাক, ডাটা শাক, কচু পাতা ও সর্ষে শাক মিলিয়ে ৫০০ গ্রাম)।
- কাঁচামরিচ: ১০-১২টি (ঝাল নিজের পছন্দমতো)।
- রসুন কুচি: ২ টেবিল চামচ।
- খাওয়ার সোডা (ক্ষার): ১ চা চামচ।
- লবণ: স্বাদমতো।
- চালের গুঁড়ো: ১ টেবিল চামচ (ঝোল ঘন করার জন্য)।
- পানি: পরিমাণমতো।
প্রস্তুত প্রণালি:
- প্রথমে সব ধরণের শাক ভালো করে বেছে ধুয়ে নিতে হবে। শাকগুলো কুচি করার প্রয়োজন নেই, তবে বড় পাতাগুলো হাত দিয়ে ছিঁড়ে ছোট করে নেয়া যেতে পারে।
- একটি হাঁড়িতে (মাটির হাঁড়ি হলে স্বাদ বেশি হয়) পরিমাণমতো পানি ফুটিয়ে নিতে হবে। পানি ফুটে উঠলে তাতে লবণ, রসুন কুচি ও মাঝখান দিয়ে ফালি করা কাঁচামরিচগুলো দিতে হবে।
- এবার ফুটন্ত পানিতে যোগ করতে হবে খাওয়ার সোডা বা ক্ষার। সোডা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি কিছুটা ফুলে উঠবে।
- এবার ধুয়ে রাখা সব শাক ফুটন্ত পানিতে দিয়ে নাড়াচাড়া করে হাঁড়িটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। চুলার আঁচ থাকবে মাঝারি।
- প্যালকার আসল বিশেষত্ব হলো শাকগুলোকে পুরোপুরি গলিয়ে ফেলা। সোডার প্রভাবে শাকগুলো দ্রুত গলে নরম হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে ডাল ঘুটনি বা খুন্তি দিয়ে নাড়িয়ে নিলে তা পানির সাথে মিশে ঘন সূপের মতো হয়ে যাবে।
- ঝোল খুব পাতলা মনে হলে সামান্য চালের গুঁড়ো পানিতে গুলে ওপর থেকে ঢেলে দিলে প্যালকাকে আঠালো হয় আর টেক্সচার হবে ঘন।
- ঝোল ঘন হয়ে এলে এবং শাকগুলো পুরোপুরি মিশে গেলে প্যালকা প্রস্তুত। মনে রাখতে হবে, এতে কোনো বাগার বা ফোড়ন দেয়ার প্রয়োজন নেই।
শীতকালে উত্তরবঙ্গে এক ধরণের বিশেষ শাক পাওয়া যায় যার নাম ‘নাপা শাক’। এ নাপা শাক দিয়ে তৈরি প্যালকা ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে অমৃতের মতো।
পরিবেশন:
প্যালকা সাধারণত গরম ভাতের সাথে খাওয়া হয়। তবে এটি খাওয়ার পূর্ণ তৃপ্তি পেতে হলে সাথে চাই ‘সিদল’ (শুটকি আর কচুর ডাটা দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার) বা শুকনো মরিচ পোড়া। অনেকে আবার শুধু বাটিতে নিয়েও এটি স্যুপের মতো চুমুক দিয়ে খান।
প্যালকা কেবল স্বাদের জন্যই নয়, গুণাগুণের জন্যও বিখ্যাত। তেল-মশলাহীন হওয়ায় এটি হজমের জন্য দারুণ। সজনে পাতার প্যালকা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে বিশ্বাস করা হয়, নিয়মিত প্যালকা খেলে পেটের অনেক অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।