ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকার গঠনের পর বিএনপির অধীনে এটিই প্রথম নির্বাচন।
এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও সমর্থকরা। তারা এ নির্বাচনকে ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত মাগুরা-২ আসনের বিতর্কিত উপনির্বাচনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ভোটের মাঠে কাউকেই অবৈধভাবে প্রভাব বিস্তার করতে দেয়া হবে না। আর বিশেষজ্ঞরা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে দেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে ভোট হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসন তিনি ছেড়ে দেয়ায় এখন উপনির্বাচন করতে হচ্ছে ইসিকে। আর তফসিল ঘোষণার পর এক প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত হয়। আজ সেখানে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ আগেই জয়যুক্ত হওয়ায় এখন আসন দুটিতে আর গণভোট হবে না।
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থীরা হলেন বিএনপির মো. রেজাউল করিম বাদশা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবিদুর রহমান ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) মো. আল-আমিন তালুকদার। এ আসনে ১৫০ কেন্দ্র ও ৮৩৫টি ভোটকক্ষে মোট ৪ লাখ ৫০ হাজার ৩০৯ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ২৫০ জন, বিজিবি ৬ প্লাটুন (১২৩ জন), র্যাবের ১০টি টিম (৭০ জন), পুলিশ ১ হাজার ৩২৭ ও আনসার ভিডিপি ১ হাজার ৯৯০ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন।
অন্যদিকে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচনে বিএনপির মো. মাহমুদুল হক রুবেল, জামায়াতে ইসলামীর মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ এবং বাসদ (মার্ক্সবাদী) প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১২৮ কেন্দ্র ও ৭৫১টি ভোটকক্ষে ৪ লাখ ৯ হাজার ৮০৬ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ভোটের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ১৪০ সদস্য, বিজিবি ১৬ প্লাটুন (৩২৮ জন), র্যাবের ১৪টি টিম (১৩৫ জন), পুলিশ ১ হাজার ১৫৫ ও আনসার ভিডিপি ১ হাজার ৭০৪ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। ভোট কেন্দ্রে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বিভিন্ন বাহিনীর ১৮-২০ জন নিরাপত্তা সদস্য থাকছেন। নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম নিয়োজিত রয়েছেন ৩৬ জন। ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষক মোতায়েন থাকছেন ১৮ জন করে। এছাড়া স্থানীয় সংস্থার পর্যবেক্ষক আছেন চার শতাধিক।
এদিকে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয়ার অভিযোগ তুলে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবিদুর রহমান (সোহেল)। শহরের নওয়াববাড়ি সড়কে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি-সমর্থিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেয়া ও দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট লোকজনকে ভোটের দায়িত্ব দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো রিটার্নিং কর্মকর্তাও বিএনপির প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছেন। ভোটগ্রহণের জন্য দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগের দাবি জানানো হলেও ভোটে কারচুপি করতে বিএনপি সমর্থিত ব্যক্তিদের প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ১০ দিন আগে ১৫০ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তার তালিকা চাওয়া হলেও তিনি তালিকা গোপন করেছেন। শেষ মুহূর্তে তালিকা পাওয়ার পর দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট ১৬ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয়া হলেও রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৯৪ সালে মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। অতীতের এমন অভিজ্ঞতা আমলে নিয়েই সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। উপনির্বাচনগুলো যেন জাতীয় নির্বাচনের মতোই শিষ্টাচার এবং প্রার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়টির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুটি আসনে যারা প্রার্থী হয়েছেন তারা যেন সমান সুযোগ পান। এখানে কাউকে সরকারদলীয় বা বিরোধীদলীয় প্রার্থী হিসেবে যেন বিবেচনা না করা হয়। সরকার নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীর অধিকারের কথা বলছে। এটা ইতিবাচক হলেও প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আমরা শুনছি। এ অভিযোগগুলো নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ করা প্রয়োজন। আর কোনো প্রার্থী যদি মিথ্যা অভিযোগ দেন, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ভোটাররাও যেন নিরাপদে তাদের ভোট দিতে পারেন সেটিও দেখতে হবে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই এ দুই আসনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের অধিকার এবং ন্যায্যতার পাশাপাশি ভোটারদের জন্যও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই এ দুই নির্বাচনেও শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। এখানে কোনো প্রার্থীকে বাড়তি সুবিধা দেয়ার সুযোগ নেই। সব প্রার্থীর জন্যই সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে।’