পুলিশের তথ্য

জ্বালানির অবৈধ মজুদ পাওয়া গেছে ১৭ জেলায়

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মেহেদী এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটিতে শনিবার অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুদ রাখা ৯০০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে।

শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয়, চলতি মাসে দেশের ১৭টি জেলায় জ্বালানির অবৈধ মজুদ চিহ্নিত করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশে জ্বালানি পাচারের ঘটনাও চিহ্নিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, পাচার, এমনকি তেল সরবরাহ ঘিরে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। সংশ্লিষ্ট এসব জেলার পাশাপাশি সারা দেশেই জ্বালানির অবৈধ মজুদ রুখতে কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে জ্বালানির অবৈধ মজুদদারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে এ সমস্যার সমাধানে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৭ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ১৭টি জেলায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব জেলার মধ্যে কক্সবাজার, শরীয়তপুর, সাতক্ষীরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম মহানগর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, পাবনা, জামালপুর, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জ, নড়াইল ও গাজীপুরে জ্বালানির অবৈধ মজুদের একটি করে ঘটনা চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি জেলায় একাধিক অবৈধ মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গাইবান্ধা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও ফরিদপুরে দুটি স্থানে জ্বালানির অবৈধ মজুদ পাওয়া গেছে।

গত ১৭ মার্চ সারা দেশে জ্বালানির অবৈধ মজুদ ও পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানের মধ্যে ২৪ মার্চ চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা আলমগীর চৌধুরীর গুদামে অভিযান চালিয়ে ছয় হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করা হয়। শনিবার ফরিদপুর সদরের হোসেন ফিলিং স্টেশন জ্বালানির মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভোক্তাদের কাছে বিক্রি বন্ধ রেখে ‘পেট্রল নেই’ বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে রাখে। এ অভিযোগে প্রতিষ্ঠান মালিককে অর্থদণ্ড দেয়া হয়।

জ্বালানির শুধু অবৈধ মজুদই নয়, প্রতিবেশী দেশে পাচারের ঘটনাও সামনে এসেছে। এ অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন সাতজন। শনিবার কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারের সময় ডিজেল, আলকাতরা, ডিজেল ইঞ্জিনসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বেশি মুনাফার আশায় অনেক ব্যবসায়ী অনুমোদন ছাড়াই জ্বালানি তেলের কারবারে যুক্ত হচ্ছেন। নেত্রকোনা হাটখলা বাজারের মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে পেট্রল মজুদ করে অতিরিক্ত মূল্যে খুচরা বিক্রি করছিল বলে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে তিন হাজার লিটার পেট্রল জব্দ করার পাশাপাশি মালিককে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদের তথ্যও উঠে এসেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদনে।

জ্বালানি খাতের অস্থিরতা নিরসনে অবৈধ মজুদদার চক্রের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানির যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটা তীব্র হয়েছে এসব অবৈধ মজুদদারের কারণে। জ্বালানি মজুদদাররা দেশের মধ্যে একটা অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন। কোনো তেল পাম্প মালিক যদি এ ধরনের অবৈধ মজুদ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে, যাতে অন্য ব্যবসায়ীরা এ অপরাধে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। আর যারা লাইসেন্স ছাড়াই জ্বালানির অবৈধ মজুদে যুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা দেখেছি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করেছে। এখানেও পুলিশকে সেই একই ভূমিকা নিতে হবে। কারণ অনেক ক্রেতাই আছেন, যারা ভুক্তভোগী হলেও মামলা করতে চান না।’

জ্বালানির অবৈধ মজুদদার ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়ায় যারা বাধা তৈরি করছেন বা অবৈধ মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। জ্বালানি সরবরাহের পাম্পগুলোতে এরই মধ্যে অনিয়ম বন্ধে একজন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করেছে সরকার। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

আরও