সরকারের সমন্বিত বাজেট, হিসাবরক্ষণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থার (আইবাস++) জিও-রেফারেন্সড ডেটা বা ভৌগোলিক অবস্থানভিত্তিক উপাত্ত পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি এ বৈষম্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পশ্চিমাঞ্চলীয় ও উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়া চাষযোগ্য জমির হেক্টরপ্রতি অনেক বেশি বরাদ্দ পায়। অন্যদিকে সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রামের মতো পূর্বাঞ্চলীয় ও উপকূলীয় জেলাগুলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক এ বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট বলে মন্তব্য করেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিতে হেক্টরপ্রতি সিলেট বিভাগে সরকার যে পরিমাণ বরাদ্দ দেয় তার তুলনায় রংপুর বিভাগে প্রায় তিন গুণ। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এটি সরকারি কৃষিসম্পদ ও সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অসমান সুযোগকে তুলে ধরছে।
গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে ‘রিপারপোজিং এগ্রিকালচারাল পাবলিক স্পেন্ডিং ফর কোয়ালিটি গ্রোথ অ্যান্ড জবস ইন বাংলাদেশস এগ্রিফুড সিস্টেম’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
সংস্থাটি আরো বলছে, রংপুর ও খুলনার মতো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলো উচ্চ বরাদ্দের কারণে উপকৃত হয়েছে এবং সেখানে দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন অর্জিত হয়েছে। তবে বাজেট বরাদ্দগুলো জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির সঙ্গে সব ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছে, পটুয়াখালী ও বান্দরবানের মতো বেশ কয়েকটি জেলা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো সীমিত সহায়তা পাচ্ছে। আর অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপ্রবণ নারায়ণগঞ্জের মতো জেলার বরাদ্দ অধিক। এ বৈষম্যগুলো মূলত অতীত বা ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা বরাদ্দ ব্যবস্থা। এটি অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন ঘটায়, যা আঞ্চলিক অসমতাকে আরো জোরদার করে। যেসব জেলায় ব্যয়ের তীব্রতা (স্পেন্ডিং ইনটেনসিটি) বেশি, সেখানে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও সামান্য কর্মসংস্থান বাড়ার প্রবণতা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কম ব্যয় হওয়া এলাকাগুলো, বিশেষ করে বরিশাল, সিলেট ও উপকূলীয় চট্টগ্রামে ক্রমাগতভাবে দুর্বল বিনিয়োগ ও কম ফলন রেকর্ড করা হয়েছে। প্রমাণভিত্তিক ও ন্যায়সংগত বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে এ ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করা গেলে সরকারি সম্পদের বণ্টনকে ঝুঁকিপ্রবণতা, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে আরো কার্যকরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে বলেও এতে বলা হয়।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জেলাভিত্তিক আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে খাদ্য ও কৃষি খাত-সংশ্লিষ্ট সরকারের ব্যয়, উৎপাদকদের জন্য সরকারের অর্থ প্রদান (উপকরণ ভর্তুকি, নগদ হস্তান্তর বা সহায়তা কর্মসূচি), কৃষি সম্প্রসারণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয়, অধিক ধান আবাদের এলাকার প্রতি হেক্টরে ধানকেন্দ্রিক সরকারি ব্যয়, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন, কৃষি খাতে কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যের হার, ২০১৬ ও ২০২২ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হারের পরিবর্তন এবং জলবায়ু ঝুঁকিপ্রবণতার হিটম্যাপ তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়, আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে খাদ্য ও কৃষি খাত-সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যয় সবচেয়ে বেশি বগুড়া জেলায়। জেলাটিতে হেক্টরপ্রতি সরকারের ব্যয় ১ লাখ ৩২ হাজার ২৯৪ টাকা। এর মধ্যে হেক্টরপ্রতি উৎপাদক তথা কৃষককে অর্থ প্রদান বাবদ ব্যয় ১১ হাজার ৮২৪ টাকা। ধান চাষের এলাকায় ধানকেন্দ্রিক সরকারের ব্যয় ১০ হাজার ১০৭ টাকা। আর আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে কৃষি সম্প্রসারণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৭৪৩ টাকা। জেলা হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার ৪২৩ টাকা ব্যয় হয় দিনাজপুরে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় জয়পুরহাটে ৮৮ হাজার ৭৯১ টাকা। চতুর্থ অবস্থানে থাকা কুষ্টিয়ায় ৮৮ হাজার ৬৩৯ ও পঞ্চম অবস্থানে থাকা নারায়ণগঞ্জে হেক্টরপ্রতি ৮৮ হাজার ৫৪১ টাকা বরাদ্দ পায়। এ তালিকার শীর্ষ দশে থাকা বাকি জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শেরপুর ও ঠাকুরগাঁও।
হেক্টরপ্রতি সবচেয়ে কম ব্যয় হয় বান্দরবান জেলায়। সেখানে হেক্টরপ্রতি বরাদ্দ মাত্র ৫ হাজার ৯৩ টাকা। এরপর সবচেয়ে কম ব্যয় খাগড়াছড়িতে। জেলাটিতে হেক্টরপ্রতি খাদ্য ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট খাতে সরকারের ব্যয় ৯ হাজার ৫৭৬ টাকা। সব ব্যয়ের তালিকায় নিচ থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি। সেখানে হেক্টরপ্রতি সরকারি ব্যয় ১০ হাজার ৯৪৭ টাকা। মৌলভীবাজারে ১৮ হাজার ৩৮০ ও কক্সবাজারে ২১ হাজার ২১৭ টাকা ব্যয় হয় সরকারের।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলা হিসেবে আবাদযোগ্য জমির প্রতি হেক্টরে উৎপাদকদের জন্য অর্থ প্রদান সবচেয়ে বেশি দিনাজপুরে। সেখানে এর পরিমাণ ১৭ হাজার ৮৯১ টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮২৪ টাকা বগুড়ায়, তৃতীয় সর্বোচ্চ ময়মনসিংহে ১১ হাজার ৮২, চতুর্থ সর্বোচ্চ নওগাঁয় ৯ হাজার ৭৬৩ ও পঞ্চম সর্বোচ্চ ৭ হাজার ২৮৯ টাকা পায় নেত্রকোনা জেলা। এ খাতে শীর্ষ ব্যয় হওয়া পাঁচটি জেলার মধ্যে তিনটিই রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের। এ খাতে আবাদযোগ্য জমির হেক্টরপ্রতি সবচেয়ে কম বরাদ্দ বান্দরবানে, ১৩৭ টাকা। খাগড়াছড়িতে ২৪২ টাকা, শরীয়তপুরে ৩১০, রাঙ্গামাটিতে ৩১৩ ও ঝালকাঠিতে ৪৪৭ টাকা। এ খাতে হেক্টরপ্রতি ১ হাজার টাকার নিচে বরাদ্দ পাওয়া জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, বরগুনা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মেহেরপুর, নরসিংদী, নড়াইল, ফেনী ও নারায়ণগঞ্জ।
আবাদযোগ্য জমির হেক্টরপ্রতি কৃষি সম্প্রসারণ, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বগুড়ায়। জেলাটির প্রতি হেক্টর জমির জন্য সরকারের ব্যয় ৩ হাজার ৭৪৩ টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৮৪ টাকা চট্টগ্রামে, কুমিল্লায় ২ হাজার ৯১০, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৭৮৭ ও রাঙ্গামাটিতে সরকারের হেক্টরপ্রতি ব্যয় ২ হাজার ২৫০ টাকা। এ খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ নড়াইলে ৪৪৫ টাকা।
ধান আবাদকেন্দ্রিক সাতটি জেলায় হেক্টরপ্রতি ১০ হাজার টাকার ওপর সরকারের ব্যয় হয়। এখানে সবচেয়ে বেশি ব্যয় নারায়ণগঞ্জ জেলায়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দিনাজপুর। এরপর রয়েছে কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাঙ্গামাটি, খুলনা ও বগুড়া। এ খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ বরগুনা জেলায়, ১ হাজার ৯৪৬ টাকা।
সরকারের যেসব এলাকায় ধানকেন্দ্রিক ব্যয় বেশি সেসব এলাকার তুলনায় কিছুটা বরাদ্দ কম, এমন জেলাগুলোতে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন বেশি। হেক্টরপ্রতি ধানের (আউশ, আমন ও বোরোর গড়) সবচেয়ে বেশি ফলন গোপালগঞ্জে, ৪ হাজার ২৩৬ কেজি। জেলাটিতে হেক্টরপ্রতি সরকারি ব্যয় ৩৬ হাজার ৯৭ টাকা। অথচ গোপালগঞ্জের তুলনায় ৩ দশমিক ৬৬ গুণ বেশি ব্যয় হওয়া বগুড়ায় হেক্টরপ্রতি ধানের ফলন ৩ হাজার ৪৩২ কেজি। হেক্টরপ্রতি ধানের ফলন সবচেয়ে কম বরিশাল বিভাগের জেলা পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশালে।
অনুষ্ঠানে কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে সরকার। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ খাতগুলোতে সরকারের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ কতটুকু কার্যকরভাবে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে, সে বিষয়ে গবেষণা ও মূল্যায়নকে সরকার সবসময় ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। কারণ তথ্যভিত্তিক গবেষণা ও সুপারিশ নীতিনির্ধারণে কার্যকর সহায়তা প্রদান করে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করেছে। কৃষিকে আরো উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই খাতে পরিণত করতে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পাটবীজ, পেঁয়াজবীজ ও আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, মাটির অম্লতা হ্রাস এবং সারের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সারের দাম ও সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা বিদ্যমান নীতি ও ব্যয় কাঠামোর দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। সুখবর হলো, এগিয়ে যাওয়ার একটি সুস্পষ্ট পথও রয়েছে। সহায়তা প্রদানের পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং ধীরে ধীরে কৃষি ব্যয়কে উচ্চ প্রত্যাবর্তনমূলক বিনিয়োগের দিকে পুনর্নির্দেশিত করা গেলে বাংলাদেশ আরো সহনশীল ও উৎপাদনশীল কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা অধিক ও ভালো আয়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যয় এখনো ব্যাপকভাবে ধান উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে আছে, যা কৃষিতে বৈচিত্র্য আনাকে নিরুৎসাহিত করে। বর্তমানে দেশের আবাদি জমির প্রায় ৭২ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং মোট ভর্তুকি সুবিধার প্রায় ৮০ শতাংশ ধান খাত পায়। অথচ প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, শাকসবজি ও কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের মতো উচ্চমূল্যের উপখাতগুলো আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির আরো বেশি সুযোগ তৈরি করতে পারে।’
অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মনসুর আহমেদ ও রিসার্চ অ্যানালিস্ট জোনায়েদ শহল। পরে বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর ড. ডিনা উমালি-ডেইনিংগারের মডারেশনে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশ নেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান, এফএওর কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ জিয়াকুন শি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী।