সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে উদ্যোক্তারা

ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাবে রূপান্তর সম্ভব

দেশের এভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত সংস্কার ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বণিক বার্তা এ কনক্লেভের আয়োজন করে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সংযোগকারী আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে ওঠার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত জরুরি বলে মনে করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে তারা নীতিগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের এভিয়েশন খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।

রাজধানীর কুর্মিটোলায় ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারের দ্য প্রেস্টিজে গতকাল অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে অংশ নিয়ে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেন খাতসংশ্লিষ্টরা। দেশের এভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত সংস্কার ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বণিক বার্তা এ কনক্লেভের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

কনক্লেভে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন। দেশের এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চার শতাধিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক বলেন, ‘থার্ড টার্মিনাল চালু হলে বছরে ২০-২৪ মিলিয়ন যাত্রী ও পাঁচ লাখ টন কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে। এখন এ সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিই মূল বিষয়। বর্তমানে দেশের এভিয়েশন বাজারের আকার ৫-৬ বিলিয়ন ডলার। এর মাত্র ২২ শতাংশ দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর দখলে। বিমান ভ্রমণ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ থাকা এ খাতের জিডিপিতে অবদান মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। তবে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে দেশের এভিয়েশন বাজারের আকারকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।’

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে এভিয়েশন হাব হওয়ার বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে কেএম মুজিবুল হক বলেন, ‘প্রতি বছর প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ যাত্রী বাংলাদেশের আকাশসীমার আশপাশ দিয়ে চলাচল করে। শুধু গালফ ও আসিয়ান অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত করেন প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ যাত্রী। অথচ বাংলাদেশের ট্রানজিট যাত্রীর হার ৫ শতাংশেরও কম। নতুন টার্মিনালে বছরে ৫০ লাখ ট্রানজিট যাত্রীসেবার সক্ষমতা থাকবে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে দ্রুত পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

দ্বিপক্ষীয় এয়ার সার্ভিস এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের ৮৩০টি ফ্লাইট রাইটস থাকলেও মাত্র ৩২৯টি ব্যবহার হচ্ছে বলে জানান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান। অব্যবহৃত ৫০১টি রাইটস দ্রুত কাজে লাগাতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বর্তমানে প্রতিদিন ৩০০-৩৫০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। স্লট ও টার্নঅ্যারাউন্ড ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে দিনে ৫০০-৬০০ ফ্লাইট পরিচালনা সম্ভব।’ এয়ারলাইনসকে সরাসরি ভর্তুকি না দিয়ে রুটভিত্তিক কর সুবিধা দেয়ারও প্রস্তাব দেন তিনি। সেই সঙ্গে বাজেট এয়ারলাইনস চালু হলে মধ্যবিত্ত ও প্রবাসীদের জন্য বিমান ভ্রমণ আরো সহজলভ্য হবে বলে মনে করেন এভিয়েশন খাতের এ উদ্যোক্তা।

আগামী ১০ বছরে দেশে উড়োজাহাজের সংখ্যা বর্তমানের প্রায় ৪৫ থেকে ২০০-তে পৌঁছতে পারে উল্লেখ করে কেএম মুজিবুল হক বলেন, ‘এখন থেকেই রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো, পাইলট, প্রকৌশলী ও দক্ষ জনবল তৈরির পরিকল্পনা করা জরুরি। কক্সবাজারকে এভিয়েশন জ্ঞানকেন্দ্র ও পর্যটন হাব হিসেবে গড়ে সেখানে এভিয়েশন স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সিমুলেটর সুবিধা তৈরি করা যেতে পারে।’

ঢাকার বিমানবন্দরে একটিমাত্র রানওয়ের কারণে এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে জানান ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি রানওয়ের কারণে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ট্যাক্সিওয়েতে উড়োজাহাজকে ১০-২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হওয়ায় অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ এবং সময়মতো ফ্লাইট পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে। এতে একটি বোয়িংয়ে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০০ ও এয়ারবাসে প্রায় ৯০০ লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি।’

থার্ড টার্মিনাল নির্মাণে এয়ার অপারেটরদের প্রয়োজন ও মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলেও মন্তব্য করেন এ উদ্যোক্তা। তার ভাষায়, টার্মিনাল মূলত অপারেটরদের কার্যক্রম ও যাত্রীসেবার জন্য। বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘কর, ভ্যাট, জ্বালানির উচ্চমূল্য, টিকিট বিক্রিতে কমিশনসহ বিভিন্ন ব্যয় দেশীয় ক্যারিয়ারগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ইউএস-বাংলা ২০২৩ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের প্রয়োজনীয় সনদ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন পেলেও এখনো লাইসেন্স পায়নি। সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স না পাওয়ার বিষয়টি প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক হাব গড়ে তুলতে শুধু টার্মিনাল নির্মাণ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ট্রানজিট যাত্রীদের ২-৬ ঘণ্টা সময় কাটানোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের শপিং, খাবার ও বিনোদনের সুযোগ থাকতে হবে। শক্তিশালী দেশীয় এয়ারলাইনস, সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ, আধুনিক অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করা সম্ভব নয়।’

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, ‘এভিয়েশন খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হবে। কার্গো হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দর পরিচালনা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং বিমানবন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিদেশী পেশাদার নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এভিয়েশন খাত দেশের রাজস্ব বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ, আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের আয় বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে বিদেশী যাত্রী আকর্ষণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এভিয়েশনের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’

আরও