হাসপাতাল থেকে আবার রণক্ষেত্রে

স্কট কার্নি ও জেসন মিকলিয়ানের ‘দ্য ভরটেক্স: দ্য ট্রু স্টোরি অব দ্য হিস্টোরি’জ ডেডলিয়েস্ট স্টর্ম অ্যান্ড দ্য লিবারেশন ওয়ার অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর ভোলার সাইক্লোন যে পাকিস্তানের ইতিহাস বদলে ভূমিকা রেখেছিল, পূর্ব বাংলার মানুষকে আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল সে বিবরণই পাওয়া যায় এ গ্রন্থে। আর এ ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র ভোলার সন্তান, জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তারকা ফুটবলার থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরের বীর যোদ্ধা। ‘দ্য ভরটেক্স’ গ্রন্থ অবলম্বনে হাফিজ উদ্দিন আহমদের সেই যাত্রার গল্প থাকছে মার্চের বিশেষ আয়োজনে। আজ প্রকাশ হচ্ছে পঞ্চম পর্ব

তখন ১৯৭১ সালের জুলাই মাস। সুঠামদেহী হাফিজের পরনে সাধারণ লুঙ্গি। কোমরের ভাঁজে অতি সন্তর্পণে লুকানো একটি পিস্তল আর একজোড়া লোহার কাঁচি। কামালপুর গ্রামের প্রান্তে এ ছদ্মবেশ নিয়ে হাফিজ আড়চোখে পাকিস্তানিদের বাঙ্কারের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তখন তার ভাবনায় ছিল ভারতের জঙ্গল থেকে ছয় সপ্তাহের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আসা ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার কথা। ঢাকা ও ভারতীয় সীমান্তের মাঝামাঝি অবস্থিত এ কৌশলগত ঘাঁটিটি দখল করতে পারলে তা হবে এ যুদ্ধের প্রথম প্রকৃত বিজয়। এতে প্রমাণিত হবে মুক্তিবাহিনী সামনাসামনিও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করতে পারবে।

তবে মূল সংকট ছিল গোয়েন্দা তথ্যের অভাব। ঘাঁটির দুর্বলতা জানতে হাফিজ ও তার দল কৃষকের ছদ্মবেশে রেকি করার সিদ্ধান্ত নেন। জুলাইয়ের এক তপ্ত বিকালে তারা যখন কাঁটাতারের খুব কাছে পৌঁছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন এক প্রকৃত কৃষক কৌশলে তাদের সতর্ক করেন। পাকিস্তানি সেনাদের দৃষ্টি এড়িয়ে লোকটি বাংলায় বলেন, ‘ভাই, এখান থেকে সরে যান। আপনাদের কারণে আমরা সবাই মারা পড়ব।’ হাফিজ বুঝতে পারেন তাদের ছদ্মবেশ ধরা পড়ে গেছে এবং বাঙ্কারের পাকিস্তানি সেনারা দীর্ঘ সময় ওই এলাকায় থাকায় স্থানীয় মুখগুলো চেনে।

তিনদিন পর, ৩১ জুলাইয়ের সূর্য ওঠার আগেই হাফিজ বুঝতে পেরেছিলেন কামালপুর আক্রমণ বাঙালির বিদ্রোহের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, তা ফলাফল যা-ই হোক না কেন। তিনি জিয়াউর রহমানের কাছে রেডিওতে বার্তা পাঠিয়ে রেকি ও প্রস্তুতির জন্য আরো এক সপ্তাহ সময় চাইলেন। কিন্তু জবাব এল—আক্রমণ আজই করতে হবে।

৩১ জুলাইয়ের সেই ভোরে হাফিজ ও সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে দুটি আলাদা দল আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। হাফিজের ‘ব্রাভো’ কোম্পানি উত্তর দিক থেকে এবং ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজের ‘ডেল্টা’ কোম্পানি পূর্ব প্রান্ত থেকে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। সেই ভোরে ৪টা ৪৫ মিনিটে আক্রমণ শুরুর কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের ১ মিনিট আগেই ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনী গোলাবর্ষণ শুরু করে দেয়। এতে পাকিস্তানিরা সতর্ক হয়ে যায় এবং মুক্তিযোদ্ধারা আকস্মিক আক্রমণের সুবিধাটা হারান। হাফিজ লক্ষ্য করলেন, তার দলের প্রায় প্রতিটি সদস্য লক্ষ্যস্থলের অনেক ওপর দিয়ে গুলি ছুড়ছেন, ফলে তাদের গোলাবারুদগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছিল। তখন বাঙ্কারের জানালাগুলো খুলে গেল আর সেখান থেকে মেশিনগানের অবিরাম গুলি শুরু হয়। প্রথম দফাতেই হাফিজের চোখের সামনে তার তিন যোদ্ধা মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

হাফিজ ও তার দল সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাইরের জট পাকানো কাঁটাতারের বেষ্টনী পর্যন্ত পৌঁছে যান এবং কাঁচি দিয়ে তা কাটতে শুরু করেন। তার ১০ গজ সামনে ল্যান্ডমাইনের বিস্ফোরণে এক যোদ্ধার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, এক মুহূর্ত পরই আরেকটি মাইন বিস্ফোরিত হয়। হাফিজ তার রাইফেল থেকে অনবরত শত্রু বাঙ্কারের মেশিনগান পজিশন লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকেন, যাতে কংক্রিটের দেয়ালে বুলেটের আঘাতের শব্দে পাকিস্তানিদের মনোযোগ বিচ্যুত হয়। তিনি বাঙ্কারের প্রথম দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে যান। কেউ একজন গ্রেনেড ছুড়ে প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর স্তব্ধ করে দেন। কিন্তু বাঙ্কার টপকে ওপারে যাওয়ার পর তিনি দেখতে পান, মূল ঘাঁটিতে যাওয়ার আগে এটি ছিল মাত্র একটি পর্যায়। এরপর আরো কয়েক স্তরের কাঁটাতার এবং পরের মেশিনগানাররা ততক্ষণে নতুন করে গুলি ছুড়তে শুরু করেছে। হাফিজ ওয়্যারলেসে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে কেবল যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পান।

কিছুক্ষণ পর হাফিজ জানতে পারেন সালাহউদ্দিন মমতাজ শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যেই আরেকটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে হাফিজের রেডিও অপারেটরের পা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রক্তক্ষরণে তিনি মারা যান। ওই একই বিস্ফোরণে হাফিজের হাতের রাইফেলের কুঁদো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, যা তিনি যুদ্ধের ডামাডোলে প্রথমে বুঝতেও পারেননি। ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকটি মর্টারের গোলা হাফিজের কাছেই বিস্ফোরিত হয়। উত্তপ্ত ধাতব টুকরো তার হাত ও কাঁধ ফুঁড়ে বেরিয়ে যায় এবং সেই ধাক্কায় তিনি ছিটকে একটি খাদের মধ্যে পড়ে যান। তার ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে পোশাক ভিজে যায়। হাফিজ শেষ শক্তি দিয়ে রেডিও অপারেটরকে পিছু হটার নির্দেশ দেন। ১৫০ জনের মধ্যে ৩৫ জন শহীদ আর সত্তর জন আহত যোদ্ধাকে নিয়ে বাহিনীটি পিছিয়ে আসে। সালাহউদ্দিনের দেহটি শত্রুর কাঁটাতারেই পড়ে থাকে। খাদের কাদার মধ্যে শুয়ে হাফিজ দেখলেন তার যোদ্ধারা একের পর এক মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। প্রতিশোধ নেয়ার শেষ ইচ্ছা থাকলেও পাশে একটি পিস্তলও না থাকা অবস্থায় তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।

হাসপাতালের শয্যায় জ্ঞান ফেরার পর হাফিজ দেখলেন ধাতব স্প্লিন্টারের আঘাতে তার শরীর ও হাত ক্ষতবিক্ষত। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরের, যে সীমান্তে মাইন পুঁততে গিয়ে নিজের হাত হারিয়েছে। সেই কিশোরের এ পরিণতি, ত্যাগ হাফিজকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনদিন পর শরীর থেকে পাকিস্তানি ও মার্কিন প্রযুক্তির স্প্লিন্টার বের করার পর হাফিজ কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। তিনি জানতে পারেন, তার দুই সহযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে রণক্ষেত্র থেকে তার অচেতন দেহ উদ্ধার করে এনেছিলেন।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে হাফিজ প্রশিক্ষণ শিবিরে গিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। জিয়া কামালপুরের পরাজয় ও অহেতুক প্রাণহানিতে মর্মাহত ছিলেন। বিশেষত নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভারতীয় বাহিনীর গোলা নিক্ষেপ নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, কারণ এই একটি ঘটনাই পুরো লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের রণকৌশলগতভাবে প্রতিকূল অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল। তিনি হাফিজকে বিশ্রাম নেয়ার পরামর্শ দেন।

এরপর কলকাতায় পৌঁছে হাফিজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশের মুখোমুখি হন। সাবেক শত্রু ভারত এখন বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে তিনি অভিনেতা আলী যাকেরের বাড়িতে ওঠেন। এরপর মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওসমানী তাকে ব্যক্তিগত খরচ দিয়ে সাহায্য করেন এবং ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামের এক নৌযুদ্ধের গোপন পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেন।

কলকাতায় হাফিজের সঙ্গে দেখা হয় তার পুরনো বন্ধু ক্রিকেটার তানভীর মাজহারের। মাজহার তাকে জানান, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল প্রদর্শনী ম্যাচের মাধ্যমে যুদ্ধের তহবিল সংগ্রহ করছে। হাফিজ তার পুরনো সতীর্থদের সঙ্গে দেখা করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ফুটবলাররা তাকে প্রস্তাব দেন যুদ্ধে না ফিরে তাদের সঙ্গে থেকে ফুটবলের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে অংশ নিতে। এতে জীবনের ঝুঁকি নেই। আবার বীরের সম্মান পাওয়া যাবে। কিন্তু হাসপাতালের সেই পঙ্গু কিশোর, শরণার্থী শিবিরের মানবেতর দৃশ্য এবং রণক্ষেত্রে ফেলে আসা সহযোদ্ধা সালাহউদ্দিনের ঝুলে থাকা নিথর দেহের দৃশ্য হাফিজকে অস্থির করে তোলে। তিনি অনুভব করেন, তার যোদ্ধারা যখন জঙ্গলে না খেয়ে লড়ছে, তখন তার এ নিরাপদ জীবন অন্যায়। হাফিজ জেনারেল ওসমানীর দেয়া সব অর্থ ফুটবলারদের তহবিলে দান করে দেন এবং একটি পুরনো জিপে চড়ে আবার সীমান্তের রণক্ষেত্রের দিকে রওনা হন।

আরও